যে শব্দগুলো সবচেয়ে বেশি বাংলা মনে হয়


মাছের টক ঝোল—জিনিসটা যে ঠিক কী, তা বাইরের কাউকে বোঝাতে গেলে রীতিমতো কালঘাম ছুটে যায়। কারি? আজ্ঞে না, কারি তো হয় বেশ ঘন, তেল-মশলাদার। স্যুপ? নৈব নৈব চ! স্যুপ ব্যাপারটা বড্ড ইউরোপীয়, তাতে ভুল কায়দায় চামচ ধরার একটা আনাড়িপনা আছে।

আমাদের ঝোল হলো পাতলা—প্রায় জলের মতো স্বচ্ছ। একটু হলুদ, একটু লঙ্কা, রুই-কাতলা হলে জিরে ফোড়ন, পাবদা ইলিশ হলে সর্ষে ফোড়ন। মাছের টক ঝোল করলে একটু টকটক। টক ভাবটা হয়তো আসে তেঁতুল বা কাঁচা আম থেকে, বা নিদেনপক্ষে সর্ষের তেলের ঝাঁঝ থেকে।মাছ—সে তো সব সময় মিষ্টি জলের, একটু-আধটু কাঁটাওয়ালা, আর সেই পাতলা ঝোলের মধ্যে মাছটা যেন ভারী পরিমিতভাবে নিজের অস্তিত্বটুকু টিকিয়ে রেখেছে। আর এর সবকিছুর নিচে, বিশেষ করে পূর্ববঙ্গে, লুকিয়ে থাকে শিদল নামের এক মজানো বা ফারমেন্টেড শুঁটকি মাছের পেস্ট, যার গন্ধে নিরস ব্যাক্তিবিশেষের বমিরসের উদ্রেক হয় —ঠিক ভিয়েতনামী রান্নায় ফিশ সসের মতন : একেবারে অদৃশ্য, অথচ অপরিহার্য এবং আটপৌরে ।

মাছের টক ঝোলের কথা তুললাম কারণ এখান থেকেই আমার এই লেখার সিরিজের সূত্রপাত। কোনো কেতাবী ব্যাকরণ বা পান্ডিত্য ফলাতে নয়—বরং এক বাটি ঝোলের সামনে বসে, যার কোনো ইন্দো-আর্য্য ব্যুৎপত্তি নেই। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যান্য জায়গায় খাওয়া খাবারগুলোর সাথে এর অদ্ভুত কাঠামোগত মিল। ভিয়েতনামী canh chua বা বর্মী mohinga-র রাইস নুডল ব্রথের মধ্যে Ngapi পেস্ট সেই একই ‘পাতলা-টক-মাছ’-এর যুগলবন্দি। এগুলো যে একই সুতোর গাঁথা, সেটা হয়তো আমি অকাট্যভাবে প্রমাণ করতে পারব না।

কিন্তু এই প্যাটার্নটা এতটা প্রকট যে একে অগ্রাহ্য করাও মুশকিল।

পাতলা-টক-মাছের এই খাদ্যসংস্কৃতি উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে আসা কোনো কিছুর অনুকরণ নয়, সংস্কৃত-বলা পুরোহিতদের দান নয়, গাঙ্গেয় সমভূমির বুকের জিনিসও নয়। এটা আসলে বাংলার চেয়েও প্রাচীন। আমাদের হাতে থাকা যেকোনো লিখিত পুঁথির চেয়ে পুরনো। আর ওই যে শিদল—ব্রাহ্মণ্যবাদী রান্নার কোনো বইতে এর টিকিও খুঁজে পাবেন না। কারণ এটা তাঁদের খাবার ছিলই না। এটা ছিল সেইসব মানুষদের খাবার, যাঁরা এই মাটিতে সংস্কৃত বা প্রাকৃত শব্দগুলো এসে পৌঁছনোর অনেক আগে থেকেই বাস করতেন।

জার্মানিতে, বিশেষত বার্লিনে, থাকার জন্য ভিয়েতনামিজ খাবারের অভিজ্ঞতা। যখন পাঞ্জাবি বা উত্তর ভারতীয় রেস্টুরেন্টের খাবারে মন ভরেনা, তখন আমার জন্য টম ইয়াম স্যুপ অমৃতসম। একটু একটু আমের টক ঝোল টাইপের মনে হয় - কিন্তু লেমনগ্রাস আর লেবুর রস দিয়ে টক, আম দিয়ে নয়।

বাঙালি সংস্কৃতির সবচেয়ে গভীর স্তরগুলো সেখানে নেই, যেখানে আমরা সাধারণত খুঁজি। তার বাস আমাদের হেঁশেলে। আমাদের মজ্জায় মজ্জায় । এমন কিছু শব্দে, যেগুলো শুনলে সবচেয়ে বেশি ‘বাংলা’ মনে হয়—এবং আমি তর্কে নামতে রাজি যে, সেগুলোই সম্ভবত আমাদের ভাষার সবচেয়ে প্রাচীন অ-বাংলা শব্দ।


চূড়ান্তভাবে “বাঙালি” শব্দ

আপনাদের একটা ফর্দ দিই। এই শব্দগুলো নিয়েই আমার বড় হয়ে ওঠা, একেবারে অস্থিমজ্জায় মিশে থাকা শব্দ—যেগুলো ঠিক ব্যাকরণ পড়ে শিখতে হয়নি, হাওয়া থেকে শুষে নিয়েছি:

ঢেঁকি — লম্বাটে সেই কাঠের যন্ত্র, পায়ে চাপ দিয়ে গাঁয়ের মেয়েরা রোজ সকালে ধান ভানত। আমি যদিও আদ্যোপান্ত শহরের ছেলে, তবুও “ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে” প্রবাদটা শুনেই বড় হয়েছি। কিছু জিনিসের স্বভাব কখনো বদলায় না!

পটল — এমন একটা বাঙালি আনাজ, যা ভূ-ভারতের আর কোথাও বিশেষ পাত্তা পায় না। দিল্লির কোনো বন্ধুকে পটল চেনাতে গেছেন কখনও? (অবশ্য আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে সংস্কৃতে ‘পটোলা’ শব্দের উল্লেখ আছে, তাই পটল হয়তো একেবারে দেশি শব্দ নয়, তদ্ভব হতে পারে; কিন্তু এর আটপৌরে বাঙালিয়ানার জন্যই একে এই তালিকায় রাখলাম, ব্যুৎপত্তিগত অস্বচ্ছতার জন্য নয়।) — তবে আমার ছোটবেলায় বড়ো বিঁচি ওয়ালা পটল খেলেই বমি পেতো।

ঝিঙে — এ আরেক রত্ন। ইশারা করে হয়তো বোঝানো যায়, কিন্তু মঙ্গলবার দুপুরে ঝিঙে-পোস্তর স্বাদ কোনো ভিনদেশি ভাষায় তর্জমা করবেন কীভাবে?

ডাঙা — স্কুলের মাঠে আমরা ‘কুমির -ডাঙা’ খেলতাম: একজন ‘কুমির ’ (বন্যা বা চোর), আর অন্য বাচ্চারা কেবল ‘ডাঙা’ বা উঁচু কোনো জায়গায় উঠলেই নিরাপদ। ভেবে দেখুন তো, আবহমান নিচু-জমিতে বাংলার বন্যার যে চিরন্তন আতঙ্ক, সেটাই কেমন সুন্দর একটা ছোটদের খেলার মধ্যে ঢুকে বসে আছে!

হাঁড়ি — রান্না করা, জল আনা, চাল-ডাল রাখার সেই মাটির পাত্র। বাঙালি সংসারের সবচেয়ে পরিচিত জিনিসটার নাম ঠিক এমনই।

আর তারপর আসে আমাদের ধ্বন্যাত্মক শব্দগুলো (Onomatopoeia)—সে এক আলাদা জগৎ! শুধু শব্দের অনুকরণে তৈরি হওয়া অদ্ভুত সব শব্দে বাংলা ভাষা রীতিমতো জমজমাট:

ঝমঝম — টিনের চালে প্রবল বর্ষার বৃষ্টির শব্দ।

টিপটিপ — হালকা ঝিরঝিরে বৃষ্টি, যেন একটু কাঁচুমাচু হয়ে পড়ছে।

গুড়গুড় — বহু দূরের মেঘ ডাকার সেই নিচু গর্জন।

সংস্কৃত অভিধান ঘেঁটে এগুলোর কোনো হদিস পাবেন না। ইন্দো-আর্য ব্যুৎপত্তি দিয়ে এদের মাজাঘষা করা যায় না। এগুলো আদ্যোপান্ত, অকাট্যভাবে বাঙালি—যাদের উৎস খোঁজা মুশকিল, পুরোপুরি তর্জমা করা অসম্ভব, আর কোনো হিন্দিভাষী প্রথমবারের জন্য এগুলো শুনলে তাঁকে বোঝানো তো আরও কঠিন। মাঝেমাঝে মনে হয় যে এতগুলো রকমের ব্যাথা-যন্ত্রনা ব্যক্ত করতে পারে বাঙালি তাই হয়তো বাংলার ডাক্তারদের রপ্তানি পাশ্চাত্যে।

বিশ্বাস করুন এটাই সবচেয়ে বড় ক্ল্যু!


এবারে আসল কথায়

এই প্রথম লেখাটায় আমি একটা মোদ্দা কথা বলে রাখতে চাই, কারণ এই সিরিজের বাকি লেখাগুলো এই ভিত্তির ওপরই দাঁড়িয়ে থাকবে:

যে শব্দগুলোকে আমাদের সবচেয়ে বেশি ‘বাংলা’ বলে মনে হয়, সেগুলো সম্ভবত বাংলা ভাষার সবচেয়ে প্রাচীন ‘অ-বাংলা’ শব্দ।

এই যে চূড়ান্ত ‘বাঙালি’ শব্দগুলো, হেঁশেলের শব্দগুলো, ভূপ্রকৃতি, যন্ত্রপাতি বা বৃষ্টির শব্দ—এগুলো হলো অবশিষ্টাংশ।

কোনো একটা ভাষা, সভ্যতা, জীবনশৈলী যখন অন্য ভাষার দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয় —মানুষগুলো থেকে যায়। এই শব্দগুলোই টিকে থাকে। ইন্দো-আর্য ভাষাভাষীরা আসার হাজার হাজার বছর আগে থেকে যাঁরা বাংলায় বাস করতেন, যাঁদের ভাষা ধীরে ধীরে কোণঠাসা হয়ে একসময় পুরোপুরি গিলে খাওয়া হয়েছিল — এটা সেই প্রাচীন জনগোষ্ঠীর ভূতুড়ে শব্দভাণ্ডার। কিন্তু তাঁদের দৈনন্দিন শব্দগুলো—যেগুলো রোজ সকালে হেঁশেলে, ঢেঁকি-তে, উৎসবের ঢাক ও ঢোলে, মাঠে-ঘাটে, বৃষ্টিতে ব্যবহৃত হতো—সেগুলো কিছুতেই এ দেশ ছেড়ে যেতে রাজি হয়নি।

এমনটা কেন হয়, তা বুঝতে গেলে ভাষার আদানপ্রদান বা ‘Language contact’-এর সময় শব্দভাণ্ডার কীভাবে কাজ করে, সেটা বোঝা দরকার। আভিজাত্যের মোড়কে থাকা গালভরা শব্দগুলো—যেমন ধর্ম, আইন, দর্শন বা জ্যোতির্বিজ্ঞানের শব্দ—খুব দ্রুত পালটে যায়। সমাজের উচ্চবিত্তরা নতুন ভাষার শব্দগুলো আপন করে নেয়, আর পুরনো শব্দগুলো দু-এক প্রজন্মের মধ্যেই হাওয়া হয়ে যায়। কিন্তু হেঁশেলের শব্দের হিসেবটা আলাদা। হেঁশেলের শব্দ ক্লাসরুমে বা মন্দিরে বসে শেখানো হয় না; তা রান্নার ফাঁকে ফাঁকে বয়স্কদের থেকে ছোটদের মধ্যে সংক্রমিত হয়। মাটির পাত্রটাকে তোলার কথা বলতে গেলে যে শব্দটা মুখ দিয়ে বেরোয়, সেটাই টিকে থাকে। এটা পড়ানো হয় না, হাতেকলমে দেখানো হয়। বইয়ের পাতায় থাকে আভিজাত্য, আর মানুষের শরীরে, হেঁশেলে, ছড়ায় থাকে শেকড়।

সংস্কৃতে ধান ভানার যন্ত্রটির নাম ‘উলূখল’ (হামানদিস্তা) এবং ‘মুসল’ (নোড়া)। এই শব্দগুলো টিকে আছে ঠিকই—কিন্তু তা কেবল পুঁথিতে, সংস্কৃত অভিধানে, বা ব্রাহ্মণ্যবাদী আচার-অনুষ্ঠানে। কিন্তু বাংলার যে আটপৌরে মানুষটি রোজ সকালে ধান ভানতেন, তিনি এই পুরো যন্ত্রটাকে ঢেঁকি বলেই ডাকতেন। আর এই ‘ঢেঁকি’ কিন্তু সংস্কৃত নয়। এর কোনো সংস্কৃত ব্যুৎপত্তিও নেই। ঐতিহাসিক ভাষাতত্ত্বের বর্তমান পণ্ডিতদের মতে, এই শব্দটা এসেছে অস্ট্রোএশিয়াটিক (Austroasiatic) ভাষাভাষী মানুষদের কাছ থেকে, যাঁরা ইন্দো-আর্যরা আসার বহু আগে থেকেই বাংলায় ছিলেন। এঁদের ভাষা আধুনিক মুন্ডা ভাষাগুলোর (যেমন সাঁওতালি, মুন্ডারি, হো) আত্মীয়, যা আজ ঝাড়খণ্ড এবং পশ্চিম ওড়িশার উচ্চভূমিতে টিকে আছে। সেখানকার মানুষরা নিজেদের এই মাটির আদি বাসিন্দা বলে দাবি করেন এবং তাঁদের লোককথাতেও সে কথার সমর্থন মেলে। জেনেটিক গবেষণাও—বিশেষ করে ডেভিড রাইখ-এর (David Reich) ল্যাবে প্রাচীন দক্ষিণ এশিয়ার জনসংখ্যার ইতিহাস নিয়ে কাজ এবং পল সিডওয়েল-এর ২০১৮ সালের অস্ট্রোএশিয়াটিক উৎস সংক্রান্ত গবেষণা—এই ধারণাকেই সিলমোহর দিচ্ছে: আজ থেকে প্রায় ৪,০০০ বছর আগে পূর্ব দিক থেকে পুরুষ-প্রধান একটি অস্ট্রোএশিয়াটিক ভাষাভাষী গোষ্ঠী পূর্ব ভারতে প্রবেশ করেছিল।


শব্দভাণ্ডারের কাটাছেঁড়া

ভাষাতাত্ত্বিক সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় ১৯২৬ সালে তাঁর যুগান্তকারী কাজ Origin and Development of the Bengali Language (সংক্ষেপে ODBL) প্রকাশ করেন—যা আজও বাংলা ঐতিহাসিক ভাষাতত্ত্বের ভিত্তিমূল। বাংলা শব্দভাণ্ডার নিয়ে তাঁর দেওয়া হিসেবটা একটু তলিয়ে দেখার মতো:

বাংলা শব্দভাণ্ডারের প্রায় ৪৪% হলো তৎসম (“তার সমান”)—যেগুলো সামান্য রদবদল হয়ে সরাসরি সংস্কৃত থেকে এসেছে। ধর্ম। কর্ম। বৃক্ষ। এগুলো হলো সেই আভিজাত্যের ধার করা শব্দ, ব্রাহ্মণ্যবাদী স্তর, যা পুরোহিত আর পুঁথির হাত ধরে এসেছিল।

বাকি প্রায় ৫৬% শব্দকে আরও দুটো ভাগে ভাগ করা যায়: তদ্ভব (“তা থেকে উৎপন্ন”)—যেগুলোর জন্ম হয়তো সংস্কৃত বা প্রাকৃতে, কিন্তু কালক্রমে এতটাই পালটে গেছে যে চেনা দায়—এবং দেশী (“দেশের নিজস্ব”)—যেগুলো কোনো অজানা বা অ-আর্য উৎস থেকে এসেছে এবং সংস্কৃতের কোনো ধার না ধেরেই বাংলায় সগর্বে টিকে আছে।

এই ‘দেশী’ খোপটার মধ্যেই আমাদের আরামের শব্দগুলোর বাস। ঢেঁকি। হাঁড়ি। ঝিঙে। ডাঙা। আপনার ঠাকুমা-দিদিমারা রোজ যে শব্দগুলো ব্যবহার করতেন।


মুন্ডা ভাষার প্রলেপ

ভাষাতাত্ত্বিকরা ‘সাবস্ট্রেট’ (substrate) বলে একটা গালভরা শব্দ ব্যবহার করেন—যখন কোনো প্রাচীন ভাষা অন্য ভাষা দ্বারা প্রতিস্থাপিত হওয়ার পরেও তার শব্দ, ধ্বনি বা ব্যাকরণের কিছু বৈশিষ্ট্য নতুন ভাষার মধ্যে টিকে যায়। বাংলা ভাষায় অস্ট্রোএশিয়াটিক ভাষার এক বিশাল সাবস্ট্রেট বা ভিত্তিস্বরুপ প্রভাব রয়েছে, বিশেষ করে মুন্ডা ভাষার। এ ছাড়াও উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে টিবেটো-বার্মান (বোড়ো/কোচ) ভাষার একটি গৌণ প্রভাবও দেখা যায়।

“অস্ট্রোএশিয়াটিক” হলো এমন এক ভাষাগোষ্ঠী যার মধ্যে বর্তমানে পূর্ব ভারতের মুন্ডা ভাষাগুলো (সাঁওতালি, মুন্ডারি, হো) এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মন-খমের (Mon-Khmer) ভাষাগুলো (ভিয়েতনামী, খমের, মন) পড়ে। এই নামকরণ থেকেই বোঝা যায় যে, একসময় ভারত থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া পর্যন্ত এক বিশাল অঞ্চল জুড়ে এই ভাষার বিস্তার ছিল, যা পরে অন্যান্য অভিবাসনের চাপে সংকুচিত হয়ে যায়। ঝাড়খণ্ড এবং ওড়িশার মুন্ডা ভাষাভাষীরাই দক্ষিণ এশিয়ায় এই গোষ্ঠীর সবচেয়ে পশ্চিম প্রান্তের জীবিত নিদর্শন।

অস্ট্রোএশিয়াটিক এবং টিবেটো-বার্মান ভাষাগোষ্ঠীর মধ্যে একটা মিল আছে — ব্যাকরণে পুংলিঙ্গ-স্ত্রীলিঙ্গের ধার ধারেনা। এবং মাগধী প্রাকৃতের হাত ধরে পূর্বভারতের যে ভাষাগুলোর জন্ম — বাংলা, অসমীয়া, ওড়িয়া, ভোজপুরি ইত্যাদি — সেগুলোতেও ব্যাকরণে লিঙ্গের অপঘাতে মৃত্যু হয়েছে।

নিচের শব্দগুলোকে অত্যন্ত প্রবলভাবে মুন্ডা ভাষার ধার করা শব্দ বলে মনে করা হয়—ইন্দো-আর্য ভাষার সাবস্ট্রেট নিয়ে গবেষণায় পণ্ডিতরা এগুলোকে স্বীকৃতি দিয়েছেন। এদের কোনো সংস্কৃত ব্যুৎপত্তি নেই, বরং মুন্ডা ভাষার সাথে ধ্বনিগত বা অর্থগত গভীর মিল রয়েছে:

বাংলাউচ্চারণঅর্থশব্দার্থের পরিমণ্ডল
ঢেঁকিdhekiধান ভানার যন্ত্রখাদ্য প্রক্রিয়াকরণ
ঠাঙি / টাঙ্গিtangiকুঠারযন্ত্রপাতি
ঝাড়jharজঙ্গল, ঝোপভূপ্রকৃতি
ডাঙাdangaউঁচু জমিভূপ্রকৃতি
হাঁড়িhariমাটির পাত্রগৃহস্থালির জিনিস
ঝিঙেjhingeএক ধরনের আনাজখাবার

খেয়াল করে দেখুন শব্দগুলো কোন ধরণের জীবনযাত্রা থেকে আসছে। এগুলো কোনো বিমূর্ত দর্শনের শব্দ নয়। দেবতার গুণগান বা মহাজাগতিক বস্তু বোঝানোর শব্দও নয়। এগুলো হলো: কোথায় গাছপালা আছে, মাটির ধরন কেমন, কিসে রান্না করবেন, কী খাবেন, ধান ভানবেন কিসে, আর কী দিয়ে কাটবেন। এগুলো হলো রোজকার বেঁচে থাকার শব্দ—আর ঠিক এই শব্দগুলোই কেউ মুছে দিতে পারেনি।


‘ঝ’-এর ঝঞ্ঝাট

এখানে ধ্বনিতত্ত্বের একটা মজার দিকের কথা না বললেই নয়, তবে একটু সাবধানতার সাথেই বলছি। বাংলায় প্রস্তাবিত বেশ কিছু মুন্ডা এবং ‘দেশী’ শব্দের শুরুতে একটা ‘ঝ’ (jh-) ধ্বনি খেয়াল করা যায়—সেই শ্বাসবহুল, ঘোষ মহাপ্রাণ ধ্বনিটা: ঝাড়, ঝিঙে, এবং বাংলা রান্নার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ ঝাল ও ঝোল।

অস্ট্রোএশিয়াটিক ধ্বনিতত্ত্বের উত্তরাধিকার হিসেবে এই প্যাটার্নটা যথেষ্ট যুক্তিসঙ্গত। কিন্তু গবেষকরা এখনো এব্যাপারে একমত নন : ‘ঝাল’ আর ‘ঝোল’-এর ব্যুৎপত্তিগত উৎস নিয়ে সত্যিই এখনও যথেষ্ট ধোঁয়াশা আছে। এগুলো যে সংস্কৃত নয়, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। এগুলো ‘সাবস্ট্রেট’ বা প্রাচীন ভিত্তিমূল থেকে আসাও খুব স্বাভাবিক। কিন্তু কোনো অকাট্য প্রমাণ এখনও মেলেনি। তবে হ্যাঁ, এই শব্দগুলো এমন একটা ধ্বনিগত পরিমণ্ডলে ঘোরাফেরা করে, যা মুন্ডা সাবস্ট্রেট শব্দের মতোই দেখতে। এটাকে একটা প্যাটার্ন বা ধরন হিসেবে দেখা যেতে পারে, তবে নিশ্চিত ব্যুৎপত্তি বলা চলে না।

একই কথা খাটে আমাদের ধ্বন্যাত্মক শব্দগুলোর ক্ষেত্রেও। ঝমঝম, টিপটিপ, গুড়গুড়—এগুলো ঠিক সাধারণ অর্থে ধার করা শব্দ নয়। শব্দের অনুকরণ করে তৈরি করা পদ প্রায় সব ভাষাতেই নিজের মতো করে গজিয়ে ওঠে। কিন্তু বাংলা ভাষায় এই ধরনের শব্দের প্রাচুর্য্য় সত্যিই অবাক করার মতো। এর একটা সম্ভাব্য কারণ হতে পারে যে, বাংলা ভাষা তিনটে প্রাচীন ভাষার মোহনায় বসে আছে—অস্ট্রোএশিয়াটিক (মুন্ডা), টিবেটো-বার্মান (বোড়ো/কোচ), আর সামান্য উত্তর-দ্রাবিড়—যাদের প্রত্যেকের নিজস্ব সমৃদ্ধ মৌখিক ও ধ্বনিগত সংস্কৃতি ছিল। আর এই তিনের মিলনেই হয়তো এমন এক ভাষার জন্ম হয়েছে, যার পরতে পরতে শব্দ আর ধ্বনির বুনন মেলানোর এক অদম্য খিদে লুকিয়ে আছে।


প্রতিধ্বনি-শব্দ: ব্যাকরণের অস্থিমজ্জায়

ভাষাতাত্ত্বিকরা বাংলার যে বৈশিষ্ট্যটিকে সবচেয়ে বেশি অস্ট্রোএশিয়াটিক প্রভাব বলে মনে করেন, তা হলো ‘প্রতিধ্বনি-শব্দ’ বা অনুকার শব্দের (echo-word) ব্যবহার। বাংলায় একটা দারুণ মজার ব্যাপার হলো, যেকোনো বিশেষ্য পদের সাথে ধ্বনিটা সামান্য পালটে একটা দ্বিতীয় শব্দ জুড়ে দিয়ে “ওই জাতীয় জিনিসপত্র” বোঝানো যায়:

ঘোড়াটোড়া (ঘোড়া থেকে) — “ঘোড়া এবং ওই জাতীয় কিছু”

কাপড়চোপড় (কাপড় থেকে) — “জামাকাপড় ইত্যাদি”

মাছটাছ (মাছ থেকে) — “মাছ বা ওই ধরনের জিনিস”

এই প্যাটার্নটাকে—যাকে পরিভাষায় echo compounding বলা হয়—অস্ট্রোএশিয়াটিক ভাষার একটা অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হিসেবে ধরা হয়, যা মুন্ডা এবং মন-খমের ভাষাগোষ্ঠীতে অহরহ দেখা যায়। এটা আদৌ সংস্কৃত বা ইন্দো-আর্য ভাষার কোনো বৈশিষ্ট্য নয়। কিন্তু এটা বাংলা ব্যাকরণের অস্থিমজ্জায় এতটাই গভীরভাবে সেঁধিয়ে গেছে যে, আমরা অবচেতনভাবেই কথায় কথায় নতুন নতুন শব্দজোড় তৈরি করে ফেলি। এটা নিছক শব্দের ধার নয়, এ হলো একেবারে ব্যাকরণ বা গঠনের ধার! মুন্ডা ভাষাগোষ্ঠীর মানুষজন ভাষাটা হারিয়ে ফেললেও, ভাষার কাঠামোর ভেতর নিজেদের ডিএনএ-টা ঠিকই রেখে গেছেন।

তাছাড়া, বাংলায় ‘numeral classifiers’ বলেও একটা ব্যাপার আছে—কোনো কিছু গুনতে গেলে যে লগ্নকগুলো জুড়ে দিতে হয়। ইংরেজিতে বলা হয় “three fish” (তিন মাছ)। বাংলায় আমরা বলি তিনটে মাছ—অর্থাৎ “তিন [বস্তু নির্দেশক] মাছ”। এই ক্লাসিফায়ার সিস্টেমটা (‘টি’, ‘টা’, ‘খানা’, ‘জন’ ইত্যাদি) সংস্কৃতের ত্রিসীমানায় নেই, কিন্তু টিবেটো-বার্মান এবং অস্ট্রোএশিয়াটিক ভাষাগোষ্ঠীতে এর ছড়াছড়ি। প্রাচীন ভাষার সেই সাবস্ট্রেট বা ভিত্তিমূলের এ আরও এক কাঠামোগত উত্তরাধিকার।


ওড়িয়া যোগসূত্র

এই প্রসঙ্গে ছোট্ট করে একটা কথা বলে রাখি, যা পরের লেখাগুলোতে কাজে লাগবে: রান্নার যে পাতলা-টক-ঝাল যুগলবন্দির কথা বলছিলাম—ঝোল, ঝাল, টক, অম্বল—ওড়িয়া ভাষাতেও এর হুবহু মিল পাওয়া যায়। ওড়িয়া রান্নাতেও ঠিক এই একই পাতলা ঝোল, ফারমেন্টেড মাছের প্রতি দুর্বলতা, এবং টক আর ঝালের একই রকম ভারসাম্য দেখা যায়, আর শব্দগুলোও প্রায় একই। এটা কিন্তু সম্প্রতি এক ভাষার অন্য ভাষা থেকে ধার করা নয়। এটা একটা যৌথ উত্তরাধিকার—এমন এক খাদ্যসংস্কৃতি, যা বাংলা আর ওড়িয়া আলাদা সাহিত্যিক ভাষা হিসেবে গড়ে ওঠার বহু আগে থেকেই বাংলা-ওড়িশা-উত্তরপূর্বের উপকূলবর্তী অঞ্চলে বিদ্যমান ছিল। আভিজাত্যের ভাষা পালটে যাওয়ার বহুকাল পরেও তা হেঁশেলে টিকে থেকেছে। টক-পাতলা-মাছের এই ধারাটি হলো পূর্বাঞ্চলের এক প্রাচীন সাবস্ট্রেট ঐতিহ্য, যা ওড়িয়া, বাংলা এবং উত্তর-পূর্বের খাবারে ছড়িয়ে আছে, এবং যা এই ভাষাগুলোর চেয়েও প্রাচীন।


চেনা জিনিসটাই সবচেয়ে প্রাচীন

চলুন, আজকের মতো এখানেই শেষ করি—এই গোটা সিরিজের মূলে থাকা একটা অদ্ভুত বৈপরীত্যের কথা বলে।

আমরা যখন ভাবি “খাঁটি বাঙালি” জিনিসটা ঠিক কী, তখন স্বভাবতই আমাদের চোখ যায় উচ্চমার্গের সংস্কৃতির দিকে: রবীন্দ্রনাথ, চর্যাপদ (দশম থেকে দ্বাদশ শতকের বৌদ্ধ সাধনসঙ্গীত, যা বাংলার প্রাচীনতম লিখিত নিদর্শন), আমাদের সাহিত্যিক ঐতিহ্য, কিম্বা দর্শনের ভারী ভারী শব্দ। মনে হয়, এগুলোই বুঝি আমাদের শেকড়, ‘গভীর’ বাঙালিয়ানা। কিন্তু ভাষাতাত্ত্বিক দিক থেকে দেখলে, এগুলো হলো অনেক সাম্প্রতিক স্তর—এগুলো ইন্দো-আর্য স্তর, সংস্কৃতের উত্তরাধিকার, আভিজাত্যের শব্দভাণ্ডার যা একটা নির্দিষ্ট সাংস্কৃতিক-ধর্মীয় কাঠামোর হাত ধরে এসেছিল এবং পুঁথিতে জায়গা পেয়েছিল বলেই আজ অবধি টিকে আছে।

আমাদের সবচেয়ে গভীর বাঙালিয়ানা—সবচেয়ে প্রাচীন, সবচেয়ে নিরবচ্ছিন্ন স্রোতটা—লুকিয়ে আছে ওই ঢেঁকি-র প্রবাদে, যা স্বর্গে গিয়েও ধান ভানে। তা লুকিয়ে আছে সেই ‘কুমির-ডাঙা’ খেলায়, যেখানে বন্যা রোজ ধেয়ে আসে আর বাঁচার জন্য আমাদের উঁচু ডাঙা খুঁজতে হয়। তা লুকিয়ে আছে রোজকার হাঁড়ি-তে, ঝিঙে-তে আর সেই পাতলা টক মাছের ঝোলে, উত্তর-পশ্চিম থেকে আসা কোনো ভাষায় যার কোনো নামই নেই। এই শব্দগুলো আমাদের ভাষার চেয়েও প্রাচীন। এগুলো এমন সব মানুষদের শব্দ, যাঁদের নাম আমরা জানি না, যাঁদের ভাষা আজ বিলুপ্ত, কিন্তু যাঁদের রোজকার রুটিন—ধান ভানা, পাতলা টক ঝোলে মাছ রাঁধা, আর বন্যা থেকে বাঁচতে মাটির চরিত্র বোঝা—সেই ভাষারই ভেতরে সগর্বে টিকে আছে, যে ভাষা একদিন তাঁদের কোণঠাসা করেছিল।

যে শব্দগুলোকে আমাদের সবচেয়ে বেশি খাঁটি বাংলা বলে মনে হয়, উৎসের দিক থেকে সেগুলো সম্ভবত সবচেয়ে কম বাংলা।

আর ঠিক এখান থেকেই আমাদের এই লেখার সিরিজের সূত্রপাত।

সূত্র

  1. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়. বাংলা ভাষার উদ্ভব ও বিকাশ (1926). কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস। ২ খণ্ড।
  2. এফ.বি.জে. কুইপার. ঋগ্বেদে আর্যরা (1991). রোডোপি, আমস্টার্ডাম। খণ্ড ১।
  3. মাইকেল উইটজেল. "দক্ষিণ এশিয়ার সাবস্ট্রেট ভাষার প্রাথমিক উৎস". মাদার টাং (ASLIP) (1999). বিশেষ সংখ্যা, অক্টোবর ১৯৯৯, পৃ. ১–৭০
  4. ফ্র্যাংক্লিন সাউথওয়ার্থ. দক্ষিণ এশিয়ার ভাষাতাত্ত্বিক প্রত্নতত্ত্ব (2005). রাউটলেজ কার্জন, লন্ডন doi:10.4324/9780203412916
  5. ডেভিড রাইখ প্রমুখ. "ভারতীয় জনসংখ্যার ইতিহাস পুনর্নির্মাণ". নেচার (2009). খণ্ড ৪৬১, পৃ. ৪৮৯–৪৯৪ doi:10.1038/nature08365
  6. পল সিডওয়েল. "অস্ট্রোএশিয়াটিক ভাষাপরিবার". অক্সফোর্ড হ্যান্ডবুক অব দ্য ল্যাঙ্গুয়েজেস অব সাউথ এশিয়া (2018). অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস

পরের পর্ব: বাঙালি হওয়ার আগে — লাল মাটির মানুষ