যে লোহা তাদের নিজের জঙ্গল কেটেছিল
দিদিমার হেঁশেলে একটা কামার (kamar) ছুরি ছিল—বেশ ভারী, একটু এবড়োখেবড়ো। এমন একটা জিনিস, যাতে হাজারবার শান দিতে দিতে তার আসল চেহারাটাই বেমালুম পালটে গেছে। যে লোকটা শান দিতে আসত, তাকেও আমরা ‘কামার’ বলেই ডাকতাম। যদিও দিদিমার আমলে সে আর গাঁয়ের বাসিন্দা ছিল না, বরং বছরে দু’বার পাড়ায় চক্কর কাটা এক ভবঘুরে শানওয়ালায় পরিণত হয়েছিল। শব্দটা কিন্তু আমাদের মজ্জায় দিব্যি গেঁথে ছিল। ঠিক যেমন বাংলার আরও অনেক কিছুর ক্ষেত্রেই হয়—একটু টান দিলেই দেখা যায়, তাদের পিছনে লুকিয়ে আছে এক সুদীর্ঘ ইতিহাস।
ছোটবেলায় আমার জানা ছিল না যে, এই ‘কামার’ শব্দটার পিছনেও একটা গাঢ় ছায়া আছে। জানা ছিল না যে, সংস্কৃত খোলসটার—karmāra, অর্থাৎ ‘যে কর্ম বা কাজ করে’—ঠিক পিছনেই এক নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে, যেখানে এককালে অন্য একটা শব্দ ছিল। এমন একটা শব্দ, যা সেই মানুষগুলো বলত, যারা এই পাহাড়ে সংস্কৃত ভাষার আগমনের বহু আগেই লোহার ব্যবহার শিখে ফেলেছিল। যে শব্দটা আজ আমরা বেমালুম ভুলে মেরে দিয়েছি।
যে পাহাড় লোহাকে মনে রেখেছিল
এই গল্পের শুরু কিন্তু বাংলায় নয়। শুরুটা ঝাড়খণ্ডে—ছোটনাগপুর মালভূমির সেই রুক্ষ, খনিজ সম্পদে ভরপুর এলাকায়। যেখানে শালবনের ঘন জঙ্গল, ল্যাটেরাইট পাথর আর লোহার আকরিক মাটির এত কাছাকাছি যে, কোথাও কোথাও বৃষ্টি পড়লে আকরিকের গায়ে জং ধরতে দেখা যায়।
খ্রিস্টপূর্ব প্রথম সহস্রাব্দের শুরুর দিকে—বা তারও আগে হতে পারে, সময়কাল নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে বিস্তর তর্কবিতর্ক আছে—এই মালভূমির কোনো এক আদিবাসী আকরিক থেকে লোহা গলানোর কায়দাটা আয়ত্ত করে ফেলেছিল। ব্রোঞ্জ নয়, কারণ ব্রোঞ্জ বানাতে গেলে দুর্লভ টিনের দরকার হয়। লোহা কিন্তু প্রায় সর্বত্রই পাওয়া যায়, যদি আপনি জানেন কোথায় তাকে খুঁজতে হবে আর কীভাবে তাকে শোধন করতে হবে। এটা কিন্তু মোটেও চাট্টিখানি কথা নয়। লোহা সবকিছুর হিসেবনিকেশ বদলে দেয়: আরো ভালো লাঙল, আরও ধারালো কুড়ুল, এমন সব হাতিয়ার যার ধার সহজে মরে না। পূর্ব ভারতের মালভূমি অঞ্চলে যে সভ্যতা এই প্রযুক্তিটা প্রথম আয়ত্ত করেছিল, স্থানীয় লোককথা আর প্রত্নতত্ত্বের পরিভাষায় তাদের বলা হয় ‘অসুর’।
এই নামটার একটু খোলসা করা দরকার, কারণ পুরাণ আর হিন্দু ধর্মে ‘অসুর’ মানে হলো ‘দানব’ বা ‘দৈত্য’। ঠিক এখানেই কোনো একটা সম্প্রদায়কে তকমা পরানোর রাজনীতিটা কেমন নিখুঁতভাবে কাজ করে, তা বোঝা যায়। একদম আদি বৈদিক সাহিত্যগুলোতে ‘অসুর’ বলতে বোঝানো হতো ‘ক্ষমতাশালী প্রভু’ বা ‘প্রতাপশালী শাসক’-এর মতো কিছু একটা। মহাভারতের বংশলতিকায় পূর্বদিকের রাজ্যগুলোর রাজাদের ‘অসুর’ বলা হয়েছে। প্রাচীন বৌদ্ধ আর জৈন গ্রন্থগুলোও স্বীকার করে যে, পূর্ব উপকূলের মানুষজন এক ধরনের ‘অসুর-ভাষা’য় কথা বলত, যা ছিল রীতিমতো সাবলীল এবং কাব্যিক—যার বর্ণনা দেওয়া হয়েছে ‘গঙ্গার স্রোতের মতো প্রবহমান’ বলে। এরা ভাষা ও সংস্কৃতি সম্পন্ন জ্যান্ত মানুষ ছিল, কোনো দানব বা রাক্ষস নয়।
‘ক্ষমতাশালী আদিবাসী শাসক’ থেকে ‘দানব’-এ এই যে অর্থের অবনমন, তা ব্রাহ্মণ্যবাদী রাষ্ট্রের পূর্বদিকে বিস্তারের সাথে একেবারে খাপে খাপে মিলে যায়। যে মানুষগুলোর হাতে মালভূমি আর তার লোহার নিয়ন্ত্রণ ছিল—যাদের সহজে বর্ণপ্রথার কাঠামোয় ঢোকানো যাচ্ছিল না—তারাই সেই আগ্রাসী ব্যবস্থার তৈরি করা পুঁথিপত্রে হয়ে উঠল রাক্ষস। অথচ প্রত্নতত্ত্ব আমাদের অন্য কথা বলে, তারা আসলে কী ছিল, তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।
শরৎচন্দ্র রায় রাঁচিতে কী পেয়েছিলেন
বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে, ভারতীয় নৃবিজ্ঞানী শরৎচন্দ্র রায় ছোটনাগপুর মালভূমিতে রীতিমতো নিয়ম করে তথ্য সংগ্রহের কাজ শুরু করেন। রাঁচি জেলায় তিনি যা পেয়েছিলেন, তা তাঁকে চমকে দিয়েছিল: একশোরও বেশি প্রাচীন নিদর্শন, যেগুলোকে স্থানীয় মুন্ডা এবং অন্যান্য আদিবাসী সম্প্রদায় নির্দ্বিধায় অসুর গড় (asur garh) এবং অসুর সাসান (asur shasan বা ‘অসুরদের গোরস্থান’) বলে চিহ্নিত করেছিল।
এগুলো কোনো ছোটখাটো বা হেলাফেলা করার মতো জায়গা ছিল না। খুন্তিটোলি আর সারাদকেলে বড়সড় খননকাজের পর বিশাল আকারের পোড়া ইটের দালানের ভিত পাওয়া গেল—হ্যাঁ, রীতিমতো পোড়ানো ইট, কাদা-মাটির নয়—আর তার সাথে পেল্লায় সব জলাধার। জনবসতিগুলো তৈরি হয়েছিল জলের উৎসের কাছাকাছি, একটু উঁচুতে। এ হলো এমন এক সভ্যতার ধ্রুপদী চিহ্ন, যারা যথেষ্ট বিত্তবান ছিল বলেই সুরক্ষার প্রয়োজন বোধ করত এবং টেকসই কাঠামো বানানোর মতো সুসংগঠিতও ছিল।
তাদের শেষকৃত্যের পদ্ধতিও ছিল দেখার মতো নিখুঁত। অসুররা তাদের মৃতদেহ দাহ করত, তারপর হাড়গোড়গুলো বড় বড় মাটির পাত্রে ভরে রাখত। এই পাত্রগুলোকে তারা বিশাল পাথরের চাঁইয়ের নিচে পুঁতে রাখত। প্রতিটি চাঁইকে আবার চার কোণায় চারটে পাথর দিয়ে এমনভাবে উঁচু করে রাখা হতো, যাতে দেখতে একটা ছোট্ট ঘরের মতো লাগে। একটা কবরের ওপর এরকম একটা পাথরের আচ্ছাদন দিতে গেলে কয়েক টন ওজনের পাথর অনেকটা দূর থেকে বয়ে আনতে হয়। বোঝাই যায়, এই সম্প্রদায়ের মধ্যে সংগঠিত শ্রম, রীতিনীতি ভাগ করে নেওয়ার চল এবং মৃতেরা যে বড়সড় স্মৃতিস্তম্ভের দাবিদার—এই বিশ্বাসটা পাকাপোক্ত ছিল।
কবরের ভেতরের জিনিসপত্রগুলো দেখলে বোঝা যায় মানুষগুলো ঠিক কীভাবে বাঁচত: ব্রোঞ্জ আর তামার চেন, বালা, পায়ের ঘুঙুর। স্ফটিক আর পাথরের পুঁতি। ছাপ-না-মারা তামার মুদ্রা। একটা জিনিস তো রীতিমতো তাক লাগিয়ে দেওয়ার মতো: ধাতু দিয়ে তৈরি এক কৃষকের ছোট্ট মূর্তি, যে দুটো বলদ দিয়ে লাঙল চষছে। ছাঁচে-ঢালা ধাতুর তৈরি কৃষিজীবনের এক অপূর্ব মিনিয়েচার দৃশ্য, যা লস্ট-ওয়্যাক্স কাস্টিং (lost-wax casting) বা মোম-গলানো ছাঁচ-পদ্ধতিতে তাদের অসামান্য দক্ষতার প্রমাণ দেয়।
আর গোটা এলাকার পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে যেটা: লোহার ধাতুমল বা স্ল্যাগ। লোহা গলানোর চুল্লির ধ্বংসাবশেষ। রাঁচি জেলায় অসুরদের সেই জায়গাগুলোর চারপাশে তাকালে লোহা-পেটানোর স্পষ্ট ছাপ চোখে পড়ে—হাজার হাজার বছরের ধাতুবিদ্যার চর্চা মাটির রঙ বদলে দিয়েছে, আর যে ধাতুমলের পাহাড় তারা তৈরি করেছিল, তা আজও সেখানে অম্লান। তারা দু’ধরনের লোহার কাজ করত, যার মধ্যে একটা ছিল উঁচু মানের ‘সাদা লোহা’, যা দিয়ে উন্নতমানের অস্ত্রশস্ত্র আর টেকসই হাতিয়ার বানানো হতো।
এই পাহাড়গুলোতে কোনো সংস্কৃতভাষী মানুষ নিজেদের রাজত্ব কায়েম করার বহু আগেই, অসুর সভ্যতা লোহা গলাচ্ছিল, ইটের ইমারত বানাচ্ছিল, তামার ব্যবসা করছিল আর রীতিমেনে মৃতদের সমাধি দিচ্ছিল। সেই যুগে, ওই অঞ্চলে তারাই ছিল প্রযুক্তিগতভাবে সবচেয়ে উন্নত সম্প্রদায়।
মুন্ডাদের স্মৃতিতে আগুনের কথা
মুন্ডাদের মুখে মুখে ফেরা গল্পগুলোর মধ্যে অসুর সভ্যতার পতনের স্মৃতি আজও টিকে আছে। এই মিথ বা লোককথার কেন্দ্রে আছেন সিং-বোঙ্গা—মুন্ডাদের সর্বোচ্চ দেবতা, যিনি আলো আর পবিত্রতার প্রতীক এবং সূর্যের সাথে সম্পর্কিত। সেই লোককথা অনুযায়ী, অসুর কামারদের বিশালাকার চুল্লির ধোঁয়া আর তাপে গোটা আকাশ ভরে গিয়েছিল, যা জঙ্গলের স্বাভাবিক নিয়মকে ব্যাহত করে আর সিং-বোঙ্গাকে খেপিয়ে তোলে। দেবতা তখন ছদ্মবেশে এসে অসুর পুরুষদের বলেন, তারা যদি নিজেদের চুল্লির আগুনে প্রবেশ করে, তবে ভেতরে প্রচুর ধনসম্পদ পাবে। তারা তাই করল। আর আগুনে পুড়ে ছাই হলো।
বেঁচে যাওয়া অসুর মহিলাদের এরপর মুন্ডা সমাজে আত্মীকরণ করে নেওয়া হলো।
এই লোককথাটি কিন্তু তার ভেতরের আসল অর্থটা লুকোনোর কোনো চেষ্টাই করে না। এটা আসলে দুটো ভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে এলাকা আর প্রযুক্তি নিয়ে সংঘাতের একটা জ্বলন্ত স্মৃতি। গল্পটা বিজয়ীদের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বলা, যেখানে একটা ধর্মীয় মোড়ক দেওয়া হয়েছে—পরাজিতদের সাথে যা হয়েছে তা তাদের প্রাপ্যই ছিল, কারণ তাদের প্রযুক্তি—সেই চুল্লি, সেই ধোঁয়া—ছিল প্রকৃতির নিয়মের পরিপন্থী। মুন্ডাদের এই আখ্যানে অসুরদের আগুন-বশ করার ক্ষমতা, যা তাদের সভ্যতার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল, সেটাই হয়ে উঠল তাদের ধ্বংসের হাতিয়ার।
প্রত্নতত্ত্বও এই উচ্ছেদ আর সম্পদ দখলের আখ্যানকে সমর্থন করে। শরৎচন্দ্র রায় এবং তাঁর পরের গবেষকরা এমন বহু নিদর্শন লিপিবদ্ধ করেছেন, যেখানে মুন্ডা সম্প্রদায় রীতিমতো অসুরদের ইটের দালান ভেঙে সেই ইট নিজেদের কাজে লাগিয়েছে। অসুরদের কবরের সেই বিশাল পাথরের চাঁইগুলো সরিয়ে নিয়ে গিয়ে নিজেদের দরকারে ব্যবহার করেছে। বিজিত মানুষদের স্মৃতিস্তম্ভগুলোই নতুন বাসিন্দাদের আচার-অনুষ্ঠানের কাঁচামাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এটা একটা-দুটো জায়গায় নয়, একটার পর একটা সাইটে, একটার পর একটা পাথরের চাঁইয়ের ক্ষেত্রে ঘটেছে।
মূল ধন্দটা কি?
লোহাই জঙ্গল সাফ করেছিল।
জঙ্গল (jangal)—শব্দটা নিয়ে একটু কুস্তি করতে হয়। সংস্কৃতে jaṅgala শব্দটা আছে ঠিকই, কিন্তু সেখানে এর অর্থ হলো শুকনো, ঊষর, অনুর্বর জমি: বাংলা শব্দটা যে ঘন অরণ্যকে বোঝায়, তার প্রায় উল্টো। বাংলায় ‘জঙ্গল’ মানে হলো বুনো জায়গা, যেখানে প্রস্তুতি ছাড়া ঢোকা যায় না। এর কারণ হয়তো স্থানীয় স্তরে অর্থের একটা পরিবর্তন—এই অঞ্চলের অনার্য ভাষাভাষী মানুষজন জঙ্গল বলতে যা বুঝত, শব্দটার অর্থ সেই দিকেই ঘুরে গিয়েছিল। পণ্ডিতদের মধ্যে এটা নিয়ে অবশ্য মতবিরোধ আছে; আমি এটাকে একটা সম্ভাবনা হিসেবেই ধরছি, ধ্রুবসত্য হিসেবে নয়।
শব্দের উৎপত্তি যাই হোক না কেন, সেটা যে অরণ্যের দিকে ইঙ্গিত করছিল তা এক্কেবারে বাস্তব: পূর্ব ভারতের সেই ঘন শাল আর মিশ্র অরণ্য, যা ছিল পাহাড়ের জীবনের পরিবেশগত ভিত্তি। এই জঙ্গলই সেই মানুষগুলোর স্বাধীনতার চাবিকাঠি ছিল, যারা এর ভেতর বেঁচে থাকার কায়দাটা জানত। লোহার কুড়ুল দিয়েই সেই জঙ্গল কাটা হয়েছিল। লোহার ফলা লাগানো লাঙল সেই সাফ করা জমি চষে ফেলেছিল।
জঙ্গল-নির্ভর মিশ্র অর্থনীতির চেয়ে লাঙল-ভিত্তিক কৃষিকাজে একদম অন্য ধরনের সমাজব্যবস্থার দরকার হয়: আপনাকে একটা নির্দিষ্ট জমির দখল নিতে হবে, ঋতু পরিবর্তনের সাথে সাথে তাকে রক্ষা করতে হবে, আর পরের প্রজন্মের হাতে তা তুলে দিতে হবে। লাঙল দিয়ে চাষ আর সম্পত্তির ধারণা—এই দুটো হাত ধরাধরি করে চলে। সম্পত্তি আর আইনি শ্রেণীবিন্যাস একসাথে চলে। আর ধ্রুপদী ভারতের সেই আইনি শ্রেণীবিন্যাসের নামই ছিল জাতপাত বা বর্ণপ্রথা।
এখানেই সেই চরম বৈপরীত্য বা প্যারাডক্স: অসুর সভ্যতাই লোহা গলানোর প্রযুক্তি আবিষ্কার করেছিল আর তাতে চূড়ান্ত দক্ষতা অর্জন করেছিল, যা কি না শেষমেশ তাদের নিজেদেরই উচ্ছেদের হাতিয়ার হয়ে দাঁড়াল। তাদের তৈরি লোহা দিয়ে চাষিরা জঙ্গল সাফ করল, ধীরে ধীরে তাদের গ্রাস করে নিলো। সাফ করা জঙ্গল হয়ে গেল চাষের জমি। আর চাষের জমির ওপর কায়েম হলো বর্ণপ্রথার অধিকার। সেই বর্ণপ্রথাই অসুরদের বংশধরদের—যাঁরা এখন কামার (kāmār) নামক সেবাদানকারী জাতি—এক অধস্তন জায়গায় আটকে রাখল। যে হাতিয়ার একদিন জঙ্গল কেটে চাষের জমি তৈরি করেছিল, সেই জমিতে যারা চাষাবাদ করত, তাদের জন্যই হাতিয়ার বানানোর কাজে এদের লাগিয়ে দেওয়া হলো।
মালভূমির মুন্ডারা লোহার প্রযুক্তি হস্তগত করল। তারা আরও জঙ্গল কাটল। লোহার কুড়ুলের পিছু পিছু জাতপাতের সীমানাও এগিয়ে চলল। পাহাড়ি সম্প্রদায়গুলো ক্রমশ আরও ছোট, আরও দুর্গম আশ্রয়স্থলে কোণঠাসা হয়ে পড়ল। আজকের ভারতে ‘তফসিলি উপজাতি’ বা শিডিউলড ট্রাইব-এর যে ভৌগোলিক মানচিত্র আমরা দেখি—অর্থাৎ উপজাতিদের বেঁচে থাকা শেষ জায়গাগুলো—তা মূলত সেইসব জমির সাথেই মিলে যায় যা এতই খাড়াই, রুক্ষ বা দুর্গম যে সেখানে লাঙল চালানো কোনো কাজের কথা নয়। জঙ্গল সাফ করার প্রক্রিয়া সেখানে পৌঁছতেই পারেনি, বা সেটাকে দখল করার যোগ্য বলে মনে করেনি।
রাজনৈতিক ক্ষমতা ছাড়া শুধু প্রযুক্তি কখনো রক্ষাকবচ হতে পারে না। শেষমেশ তা বেহাত হয়েই যায়।
‘কামার’ শব্দটা যা বলে না
সংস্কৃত karmāra শব্দটা এবং তার ব্যুৎপত্তি একেবারেই স্পষ্ট: karma (কর্ম বা কাজ) এবং তার সাথে কর্তা-বাচক প্রত্যয় -āra (আর), সব মিলিয়ে ‘যে কাজ করে’ বা ‘কারিগর’। এটাই বাংলায় এসে হলো ‘কামার’ (kāmār), অর্থাৎ কর্মকার জাতি।
এই ব্যুৎপত্তি নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই। আমি এমন কোনো দাবি করছি না যে ‘কামার’ শব্দটার পিছনে কোনো লুকিয়ে থাকা অনার্য উৎস আছে, যা প্রত্নতত্ত্ব খুঁড়ে বের করেছে। সংস্কৃত ব্যুৎপত্তিটা এখানে একদম জলের মতো সোজা।
কিন্তু এই ব্যুৎপত্তি আপনাকে এটা বলে না যে, এই সংস্কৃত তকমাটা জুড়ে দেওয়ার আগে ঠিক কী ঘটেছিল। লোহা-গলানো অসুরদের নিশ্চয়ই নিজেদের একটা নাম ছিল। তাদের নিজেদের পেশার, চুল্লির, বা লোহার বিভিন্ন মান বোঝানোর নিজস্ব নাম ছিল। আমরা সেই শব্দগুলোর একটাও জানি না। যখন লোহা তৈরির কারিগর সম্প্রদায়কে সেবাদানকারী গোষ্ঠী হিসেবে জাতপাতের কাঠামোয় ঢুকিয়ে নেওয়া হলো, তখন তাদের আদিবাসী আত্মপরিচয়ের জায়গাটা দখল করে নিল এই সংস্কৃত তকমা—karmāra বা কারিগর। তাদের প্রযুক্তিটা শুধু রেখে দেওয়া হলো। আর মুছে ফেলা হলো তাদের নিজেদের দেওয়া নামগুলো।
‘অসুর’ শব্দটার ক্ষেত্রে ঠিক একই জিনিস ঘটেছিল, তবে উল্টো দিক থেকে। ব্রাহ্মণ্যবাদী বিস্তারের তকমা-পরানোর খেলায় শব্দটা ‘ক্ষমতাশালী আদিবাসী শাসক’—মহাভারতের বংশলতিকার সেই পূর্বদিককার রাজা—থেকে সোজা ‘দানব’-এ এসে ঠেকল। পুঁথিপত্রে এই মানুষগুলোকে দানব বলে দাগিয়ে দেওয়া হলো। আর তাদের কারিগরদের সেবাদানকারী জাতি হিসেবে আত্মসাৎ করে সংস্কৃত নাম দেওয়া হলো। প্রযুক্তিটা দিব্যি টিকে গেল। কিন্তু দু’দিক থেকেই তাদের নিজস্ব পরিচিতি মুছে দেওয়া হলো।
অসুররা কামারকে কী বলত? আমরা জানি না। রাঁচি জেলার মাটিতে আজও সেই চুল্লিগুলো লুকিয়ে আছে। ধাতুমলের সেই পাহাড় আজও দৃশ্যমান। তাদের বংশধরেরা আজও গুমলা জেলার গাঁয়ে গাঁয়ে বেঁচে আছে। কিন্তু শব্দটা হারিয়ে গেছে চিরতরে।
যে মানুষগুলো আজও সেখানে রয়ে গেছে
অসুর সম্প্রদায় কিন্তু আজও টিকে আছে। ঝাড়খণ্ডে—গুমলা আর লোহারদাগা জেলায়—অল্প সংখ্যায় তাদের দেখা মেলে। এমন কিছু গ্রাম আছে, যেখানে আজও কয়েকটি পরিবার সেই প্রাচীন পদ্ধতিতে লোহা গলানোর কাজ করে, যা শরৎচন্দ্র রায়-এর নথিবদ্ধ করা সেই আদি চুল্লির ঐতিহ্যের সরাসরি ধারাবাহিকতা বহন করে চলেছে।
ভারত সরকার তাদের পার্টিকুলারলি ভালনারেবল ট্রাইবাল গ্রুপ (PVTG) বা বিশেষভাবে দুর্বল উপজাতি গোষ্ঠী হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এই তকমাটা সেইসব সম্প্রদায়ের জন্যই বানানো, যাদের জনসংখ্যা কমছে বা স্থবির হয়ে আছে, যারা এখনও প্রাক-কৃষি বা স্থানান্তর-কৃষি অর্থনীতির উপর নির্ভরশীল, যাদের শিক্ষার হার তলানিতে, আর যারা কোনোমতে জীবনধারণ করছে।
২০০৬ সালের অরণ্য অধিকার আইন এবং ১৯৯৬ সালের পেসা (PESA - Panchayats Extension to Scheduled Areas Act) আইন—দুটোই কিছুটা হলেও অসুরদের মতো সম্প্রদায়ের অবস্থার কথা ভেবেই তৈরি হয়েছিল: ঔপনিবেশিক যুগে এবং স্বাধীনতার পর বননীতির জাঁতাকলে পড়ে যে জঙ্গল-নির্ভর সম্প্রদায়গুলো তাদের জমি হারিয়েছিল, তাদের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার জন্যই এই আইন। এগুলো বাংলার মতোই ঝাড়খণ্ডেরও আইন। পূর্ব ভারতের মালভূমি—যা এখন ঝাড়খণ্ড, ওড়িশা আর পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে ছড়িয়ে আছে—রাষ্ট্রীয় সীমানা ছাড়িয়ে তাদের একটা আইনি ইতিহাস এবং জমি থেকে উৎখাত হওয়ার এক অভিন্ন ইতিহাস রয়েছে।
অসুরদের সেই প্রত্নক্ষেত্রগুলো রাঁচি জেলায়। পিভিটিজি (PVTG) গ্রামগুলো গুমলায়। শরৎচন্দ্র রায় কাজ করেছিলেন ঔপনিবেশিক বিহারে। এটা আসলে ঝাড়খণ্ডেরই গল্প। কিন্তু বাণিজ্যের পথ ধরে এটা বাংলার ইতিহাসের সাথেও জুড়ে যায়। যে লোহা দিয়ে জঙ্গল সাফ করে একদিন বদ্বীপ বাংলায় লাঙল-চষা জমির বিস্তার ঘটেছিল, সেই লোহাই এই সেতুবন্ধন করেছিল। তবে এই প্রক্রিয়ার যারা সূত্রপাত করেছিল, তারা বাংলার পশ্চিমে, ওই মালভূমিতেই বাস করত, আর আজও করে।
ধাতুবিদ্যার মহারথী—যাদের লোহার প্রযুক্তি ধ্রুপদী ভারতের বস্তুগত সংস্কৃতির রূপরেখা তৈরি করে দিয়েছিল—প্রায় তিন হাজার বছরের ব্যবধানে তারাই আজ বিশেষভাবে দুর্বল এক উপজাতি গোষ্ঠী!
ব্যুৎপত্তির গভীরে লুকিয়ে থাকা নিস্তব্ধতা
হেঁশেলের সেই কামার (kāmār)। সেই লোকটা, যে বছরে দু’বার ছুরি-বঁটিতে শান দিতে আসত, যে তার শানপাথর, তেল আর নিস্তব্ধ দক্ষতাটুকু পুঁটুলিতে বেঁধে বাড়ি বাড়ি ঘুরে বেড়াত। তার একটা জাত-উপাধি ছিল—‘কামার’—যা কিনা একটা সংস্কৃত শব্দ, সংস্কৃত ‘কর্ম’ শব্দ থেকে যার উৎপত্তি, অর্থ কারিগর। কিন্তু ওটা তার ইতিহাস নয়। ওটা হলো একটা তকমা, যা তার আসল ইতিহাসটাকে প্রতিস্থাপন করেছে মাত্র।
তার ইতিহাসের শুরুটা ঝাড়খণ্ডের শালবনের কোথাও। এমন একটা সম্প্রদায়ের মধ্যে, যারা বদ্বীপ বাংলার কেউ লোহার কথা কানে শোনার বহু আগেই আকরিক লোহা থেকে হাতিয়ার বানানোর কায়দাটা শিখে ফেলেছিল। সেই ইতিহাস বয়ে চলে রাঁচিতে শরৎচন্দ্র রায়ের খুঁজে পাওয়া সেই চুল্লিগুলোর মধ্যে দিয়ে, ল্যাটেরাইটের বৃষ্টিতে আজও জং ধরতে থাকা ধাতুমলের পাহাড়ের মধ্যে দিয়ে, সিং-বোঙ্গার মিথ আর আগুনে ঝাঁপ দেওয়া অসুর পুরুষদের মধ্যে দিয়ে। সেই ইতিহাস জড়িয়ে আছে ওই সম্প্রদায়েরই বানানো হাতিয়ার দিয়ে ধীরে ধীরে জঙ্গল সাফ হওয়ার গল্পে, বর্ণপ্রথার সীমানা ক্রমশ এগিয়ে এসে একদিন ওই হাতিয়ার-নির্মাতাদেরই একটা অধস্তন সেবাদানকারী গোষ্ঠীতে পরিণত করার এবং তাদের একটা সংস্কৃত নাম ধরিয়ে দেওয়ার গল্পে।
আপনার দিদিমার হেঁশেলে যে ছুরিটা রাজত্ব করত, সেখানে পৌঁছতে তাকে সত্যিই অনেকটা পথ পেরোতে হয়েছিল।
সূত্র
- এস.সি. রায়. মুন্ডা এবং তাদের দেশ (1912). যোগেন্দ্রনাথ সরকার, কলকাতা। রাঁচিতে অসুর/মুন্ডা প্রত্নক্ষেত্রের নথিভুক্তকরণ ↗
পরের পর্ব: বাংলাভাষার চেয়েও পুরনো এই ছড়া