নদীর স্মৃতিচারণ
“বাঙালির ইতিহাস জলে লেখা।” — মধ্যযুগের বাংলার ইতিহাসবিদ নীহাররঞ্জন রায়ের কথাটা ধার করেই শুরু করা যাক।
এই তো ২০২৪ সালে আমাদের সংবিধান পঁচাত্তর বছরে পা দিল। ওদিকে সাঁওতালদের ‘পাড়হা’ (গ্রামের নির্বাচিত মোড়ল, গোষ্ঠীশাসন, আর নিজেদের মধ্যে ঝগড়াঝাঁটি মিটিয়ে নেওয়ার একটা যৌথ ব্যবস্থা) সিস্টেমটা চলছে কয়েক হাজার বছর ধরে। মজার ব্যাপার হলো, আমাদের মহান রাষ্ট্র এই দুটো জিনিসকেই সযত্নে তার আইনের খাতায় তুলে রেখেছে—আর তারপর ‘উন্নয়ন’-এর দোহাই দিয়ে সেই পুরনো ব্যবস্থাটার বারোটা বাজিয়ে ছেড়েছে!
এই লেখামালার ইতি টানব এই টানাপোড়েনটা দিয়েই। কোনো জাদুকরী সমাধান আমার কাছে নেই। বরং এমন একটা খোলা প্রশ্ন রেখে যাব, যেটা নিয়ে অন্তত আমাদের একটু অস্বস্তিতে ভোগা উচিত বলে আমার মনে হয়।
‘বাঙালি’ আসলে কে?
ছোটবেলায় কেউ এই প্রশ্নটা করলে উত্তরটা জলের মতো সোজা ছিল। যারা বাংলা বলে, জমিয়ে মাছের ঝোল খায়, র্যাডক্লিফ সাহেবের পেন্সিলের দাগের এপার-ওপারে বসে দুর্গাপূজা বা ঈদ উদ্যাপন করে, আর বাংলার বাইরে গেলেই একটা অদ্ভুত হোমসিকনেসে ভোগে—তারাই তো বাঙালি! উত্তরটা যে ভুল, তা নয়। তবে বড্ড একপেশে, আর বড্ড পাতলা।
এই সিরিজের সাতটা লেখা পার হওয়ার পর, উত্তরটা এখন বেশ ভারী হয়ে দাঁড়িয়েছে—আর যাদের জাত্যভিমান বা পরিচয়ের ‘পিউরিটি’ নিয়ে বড্ড ছুঁতমার্গ, তাদের পিলে চমকে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট!
বাঙালি আসলে একটা পলির আস্তরণ। স্তরে স্তরে জমাট বাঁধা:
সবচেয়ে নিচের বা পুরনো স্তরটা হলো অস্ট্রোএশিয়াটিক—সেই মুন্ডা-ভাষী মানুষের দল। অজয় নদের ধারে পাণ্ডু রাজার ঢিবিতে যাদের কঙ্কাল মিলেছে, তাদের সাথে আজকের সাঁওতালদের চেহারার দারুণ মিল। ধানচাষের যে শব্দগুলো আমরা আজও না ভেবেচিন্তেই রোজ বলে চলেছি, সেগুলো এদেরই দান। বাংলার দলিত আর পূর্ববঙ্গের বদ্বীপের মানুষদের রক্তে O1b1a1a জেনেটিক ধারাটা আজও প্রবলভাবে টিকে আছে। এরাই ছিল এই বদ্বীপের আদি বাসিন্দা—যারা নদী, জলাভূমি আর মাছগুলোর প্রথম নামকরণ করেছিল।
তার উপরের স্তরটা দ্রাবিড়দের (এটা নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে বিস্তর চুলোচুলি থাকলেও গাঙ্গেয় উপত্যকা জুড়ে জায়গার নামগুলো দেখলে বেশ বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়)। তার উপরে ইন্দো-আর্যদের বিস্তার—লাঙল দিয়ে চাষ, যজমানি প্রথা, আর সেই অমোঘ বর্ণপ্রথা, যা ছুঁয়েছে তাকেই ওলটপালট করে দিয়েছে। তার উপরে উত্তর-পূর্বের পাহাড় থেকে আসা তিব্বতি-বর্মন জনগোষ্ঠী, যাদের ছাপ বাংলার প্রান্তিক অঞ্চলগুলোতে আজও স্পষ্ট। তার উপরে সুলতানি আর মুঘল আমলের ফার্সি-আরবি সংস্কৃতির প্রলেপ। আর একেবারে উপরের স্তরে রয়েছে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক রাজ—ইংরেজদের ধার দেওয়া শব্দ, প্রশাসনিক ছক, আর ১৯০৫ ও ১৯৪৭ সালের মানচিত্র-কাটাকাটির সেই নৃশংস ইতিহাস।
বাঙালি ব্রাহ্মণদের জিনোমে ANI (Ancestral North Indian, অর্থাৎ ইন্দো-আর্যদের সাথে আসা সেই স্টেপস অঞ্চলের জিনগত ধারা)-এর ভাগ বেশি। অন্যদিকে বাংলার দলিত আর পূর্ববঙ্গের মানুষদের মধ্যে ASI (Ancestral South Indian, মানে আর্যদের আসার আগেকার আদিম দক্ষিণ এশীয় জিন) এবং সেই মুন্ডাদের O1b1a1a হ্যাপ্লোগ্রুপের ভাগটা বেশি। পূর্ববঙ্গের মুসলিম সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে (যদিও অকাট্য প্রমাণ নিয়ে এখনো তর্ক চলছে), সম্ভবত প্রাক-ইন্দো-আর্য জিনের অনুপাত যেকোনো বাঙালি উপজাতির তুলনায় সবচেয়ে বেশি।
বাঙালির এই স্তরীভূত ইতিহাস আসলে তার ভৌগোলিক ঠিকানা—গঙ্গার বদ্বীপেরই নিখুঁত প্রতিচ্ছবি।
বন্যার জল যেমন প্রতি বছর উর্বর নতুন পলি রেখে যায়, ইতিহাসের স্রোতও ঠিক তেমনই নতুন সংস্কৃতির আস্তরণ ফেলে গেছে এই ভূখণ্ডে। বদ্বীপের নিয়মে ওপরের নতুন পলি সবসময় বেশি দৃশ্যমান ও কদরপ্রাপ্ত, আর তার নিচেই চাপা পড়ে বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যায় পুরনো স্তরগুলো। অথচ, সেই অদৃশ্য এবং বিস্মৃত প্রাচীন পলির ভিত্তির ওপরেই দাঁড়িয়ে আছে আজকের গোটা বদ্বীপ আর সম্পূর্ণ ‘বাঙালি’ সত্তা।
ইটনের ফ্রন্টিয়ার থিসিস: পুরনো খেলার নতুন চাল
রিচার্ড ইটন সাহেবের ১৯৯৩ সালের বই The Rise of Islam and the Bengal Frontier হলো এমন একখানা বই, যা পড়ার পর আপনার চেনা ধারণাগুলো সব হোঁচট খাবে। ইটনের আগে, বাংলা কেন উপমহাদেশের সবচেয়ে বড় মুসলিম-অধ্যুষিত অঞ্চল হলো, তার কিছু বাঁধাধরা ব্যাখ্যা ছিল: হয় তরোয়ালের জোরে ধর্মান্তর, নয়তো মধ্য এশিয়া থেকে দলে দলে লোক আসা, সুলতানি আমলের রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা, অথবা বর্ণপ্রথার অত্যাচার থেকে বাঁচতে সমাজের নিচুতলার মানুষদের বিদ্রোহ।
ইটন সাহেব এই চারটে তত্ত্বকেই ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দিলেন। বদলে তিনি বেশ একটা চমকপ্রদ কাঠামোগত ব্যাখ্যার প্রস্তাব দিলেন।
বাংলায় মুসলিমদের সবচেয়ে বড় জমায়েত পূর্ববঙ্গে—যেখানে কৃষিজমি সবচেয়ে নতুন, যেখানে বদ্বীপের জঙ্গল সবচেয়ে দেরিতে সাফ করা হয়েছে। পশ্চিমে নয়, যেখানে ব্রাহ্মণতান্ত্রিক হিন্দু সংস্কৃতি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে শেকড় গেড়ে বসেছিল। মুঘল আমলে পূর্ববঙ্গের বদ্বীপ অঞ্চলে জঙ্গল কাটা আর বসতি স্থাপনের কাজটা শুরু হয়েছিল মূলত সুফি পীরদের হাত ধরে। এই পীরেরা কেবল ধর্মগুরু ছিলেন না, তাঁরা ছিলেন রীতিমতো কৃষি-উদ্যোক্তা! জঙ্গল সাফ করে, গ্রাম বসিয়ে, যেখানে আগে কোনোদিন ধানের চাষ হয়নি, সেখানে আস্ত একটা সামাজিক পরিকাঠামো তৈরি করেছিলেন তাঁরা।
যারা ধর্মান্তরিত হয়েছিল, তারা বর্ণপ্রথার অত্যাচারে অতিষ্ঠ হওয়া কোনো হিন্দু ছিল না। তারা ছিল একেবারে প্রান্তিক মানুষ—এমন সব জনগোষ্ঠী, যারা তখনও ব্রাহ্মণতান্ত্রিক হিন্দু বা বৌদ্ধ সমাজের মূল স্রোতে ঢোকেইনি। এদের মধ্যে সেই অস্ট্রোএশিয়াটিক, তিব্বতি-বর্মন বা অন্যান্য প্রাক-ইন্দো-আর্য গোষ্ঠীর লোকেরাই বেশি ছিল, যারা সবেমাত্র পাকাপাকিভাবে কৃষিকাজে হাত পাকাচ্ছিল।
ইটনের উপসংহারটার মধ্যে একটা দারুণ সৌন্দর্য আছে। বাংলায় ইসলামের বিস্তার কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটা ছিল হাজার হাজার বছর ধরে চলা একটা পুরনো প্রক্রিয়ারই নতুন রূপ। দক্ষিণ এশিয়ায় যুগের পর যুগ ধরে কখনো ব্রাহ্মণতান্ত্রিক হিন্দু, কখনো বৌদ্ধ, আর শেষে ইসলামিক সভ্যতাগুলো এই প্রাক-ইন্দো-আর্য প্রান্তিক মানুষদের নিজেদের নতুন সমাজব্যবস্থায় টেনে নিয়েছে। প্রতিবারই এই সীমানাটা একটু একটু করে পুবে সরেছে। প্রতিবারই পলি জমে নতুন জমি জেগেছে। আর প্রতিবারই একেবারে প্রান্তের মানুষগুলোকে আপন করে, নতুন করে সাজিয়ে, নতুন নাম দেওয়া হয়েছে।
ষোড়শ শতাব্দী থেকে গঙ্গার মূল প্রবাহটা ভাগীরথী থেকে ক্রমশ সরে গিয়ে পদ্মার দিকে বইতে শুরু করে। এর ফলে কৃষির ভরকেন্দ্রটা পশ্চিম বাংলা থেকে পূর্ব বাংলায় সরে যায়। এটা কোনো রাজনৈতিক পলিসি ছিল না—এটা স্রেফ ভূগোলের খেলা! কিন্তু এই খেলাটাই আজকের বাংলাদেশের মানচিত্র ঠিক করে দিয়েছে।
লালন এবং এক জীবন্ত সমন্বয়
আঠারো শতকে কুষ্টিয়ায় (আজকের বাংলাদেশে) জন্ম নেওয়া লালন ফকির তো আর গায়ে পড়ে আধুনিক সেকুলার হিউম্যানিজমের প্রতীক হতে চাননি! তিনি ছিলেন স্রেফ একজন ভবঘুরে আধ্যাত্মিক সাধক—বাউল ঐতিহ্যের এক ফকির, যার নিজের বলতে কিচ্ছু নেই। বাউলদের এই ধারায় হিন্দু-মুসলমানের ভেদাভেদ মুছে ফেলাটা কোনো রাজনৈতিক অবস্থান নয়, ওটা তাদের দৈনন্দিন সাধনারই অঙ্গ।
তাঁর গানে তিনি পরিষ্কার বলেছেন যে জাত বা ধর্ম দিয়ে মানুষকে মাপাটাই চরম বোকামি:
সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে
শয়ে শয়ে গানে তিনি একটাই উত্তর দিয়ে গেছেন—প্রশ্নটাই আগাগোড়া ভুল! ঈশ্বরের বাস কোনো মন্দির বা মসজিদে নয়, বরং নিজের শরীরের ভেতরেই তাঁর আস্তানা। একেই বলে দেহের সাধনা।
অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতকের চর্যাপদের (যা কিনা বাংলায় লেখা সবচেয়ে পুরোনো সাহিত্য) সেই সহজিয়া বৌদ্ধধর্মের সাথে এর অদ্ভুত মিল। আবার মুন্ডা সম্প্রদায়ের সেই অব্রাহ্মণ্য আধ্যাত্মিক চর্চার সাথেও এর গভীর আত্মীয়তা আছে, যেখানে ঈশ্বরকে খোঁজা হয় জঙ্গল, পাহাড় আর পূর্বপুরুষদের আত্মার মধ্যে, কোনো পুরোহিতের মন্ত্রে নয়।
এটা কিন্তু আধুনিক যুগের বাবুদের সেকুলারিজমের প্রজেক্ট নয়—যেখানে দুটো ধর্মের মানুষ ভদ্রভাবে একে অপরের সাথে করমর্দন করে। এটা হলো চার হাজার বছর ধরে এই বদ্বীপে মানুষের স্তরে স্তরে জমে ওঠার একটা স্বাভাবিক ফল, যেখানে কোনো পরিচয়ই কখনো পুরোপুরি ফিক্সড ছিল না। বাউল বা ফকিরি ধারা বাংলার নদীর মতোই খাঁটি বাঙালি—তারা যে কিছু একটা প্রমাণ করার জন্য তৈরি হয়েছিল তা নয়, বরং এই নির্দিষ্ট মাটি, জল আর মানুষের জমাট বাঁধা ইতিহাসের বুক ফুঁড়েই তাদের জন্ম।
রাষ্ট্র যা জানে এবং সযত্নে ভুলে যায়
আদিবাসীদের যে এই জমির ওপর একটা জন্মগত অধিকার আছে, সেটা বোঝার মতো বেশ চমৎকার (যদিও নিখুঁত নয়) একটা আইনি কাঠামো আমাদের সংবিধানে আছে।
সংবিধানের পঞ্চম তফসিল (আর্টিকেল ২৪৪) জনজাতি অধ্যুষিত এলাকার জন্য বিশেষ রক্ষাকবচ দিয়েছে। ষষ্ঠ তফসিল উত্তর-পূর্বে স্বশাসিত জেলা পরিষদ তৈরি করেছে। PESA ১৯৯৬ জনজাতি এলাকাগুলোতে গ্রামসভার হাতে ক্ষমতা তুলে দিয়েছে, যেখানে জমি ব্যবহারের আগে তাদের সম্মতি নেওয়াটা বাধ্যতামূলক।
২০০৬ সালের ফরেস্ট রাইটস অ্যাক্ট তো স্পষ্ট স্বীকার করেই নিয়েছে যে ঔপনিবেশিক আর স্বাধীন ভারতের বননীতি আগাগোড়াই অন্যায্য ছিল। ছোটনাগপুর টেন্যান্সি অ্যাক্ট আর সাঁওতাল পরগনা টেন্যান্সি অ্যাক্ট আদিবাসীদের জমি অ-আদিবাসীদের হাতে চলে যাওয়া থেকে আটকায়।
তার মানে, আমাদের রাষ্ট্রকাঠামো এই ইতিহাসটা জানে। আমাদের আইনপ্রণেতারা সব জেনেশুনেই এই আইন বানিয়েছিলেন।
কিন্তু মশাই, মজাটা দেখুন! এই একই রাষ্ট্র আবার সেই পঞ্চম তফসিলভুক্ত এলাকায় খনির ইজারা দেয়। ১৯৯৭ সালের সমতা রায়ে সুপ্রিম কোর্ট বলেছিল, তফসিলভুক্ত এলাকায় কোনো বেসরকারি কোম্পানি খনি খুঁড়তে পারবে না। আর তারপর? রাজ্য সরকারের মধ্যস্থতায় সুকৌশলে সেই রায়কে বুড়ো আঙুল দেখানো হলো। ১৮৭১ সালের ক্রিমিনাল ট্রাইবস অ্যাক্ট ১৯৫২ সালে বাতিল করে তার জায়গায় আনা হলো হ্যাবিচুয়াল অফেন্ডারস অ্যাক্ট—সম্প্রদায় একই রইল, আইনের নাম বদলালো, আর নজরদারিটাও দিব্যি রয়ে গেল। ১৯৪৭ সালের পর থেকে উন্নয়নের ঠেলায় প্রায় ৫ থেকে ৬ কোটি মানুষকে ভিটেমাটি ছাড়তে হয়েছে—এই বিশাল সংখ্যার একটা বড় অংশই হলো আদিবাসী সম্প্রদায়।
এই গল্পটা শুধু বাঙালির নয়। PESA আর ফরেস্ট রাইটস অ্যাক্টের এই আইনি টানাপোড়েন বাংলা, ঝাড়খণ্ড, বিহার আর ওড়িশার সমস্ত আদিবাসীদের জন্যই সত্যি। বদ্বীপ আর মালভূমি—দুটোই আসলে এক সুদীর্ঘ বাক্যের দুটো অংশ মাত্র।
সেই দার্শনিক প্রশ্ন, যা নিয়ে এতক্ষণ বকবক করলাম
আটটা পর্ব ধরে ঘ্যানঘ্যান করার পর আসল যে প্রশ্নটাতে আসতে চাইছিলাম, সেটা এবার বলি।
একটা সংস্কৃতি যদি দশ হাজার বছর ধরে টিকে থাকে, নিজেদের জল, জঙ্গল, জমি, বিয়ে, ঝগড়াঝাঁটি আর যৌথ স্মৃতিকে চমৎকারভাবে পরিচালনা করে আসে, তবে কোন যুক্তিতে আমরা তাদের ‘মূলস্রোতের বাইরের লোক’ বলে দেগে দিই?
সাঁওতালদের পাড়হা সিস্টেমটা ইন্দো-আর্যদের বিস্তার সামলেছে। মৌর্য, গুপ্ত, বাংলার সুলতান, মুঘল, ইংরেজ এমনকি স্বাধীনতা—সব কিছুর পরেও সেটা টিকে আছে। সাঁওতাল পরগনায় আজও সেটা রমরমিয়ে চলছে। অন্যদিকে, আমাদের এই পশ্চিমি লিবারেল প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রের বয়স বড়জোর ২০০ বছর হবে, আর এরই মধ্যে তার যা হাঁসফাঁস অবস্থা, তা তো রোজই খবরের কাগজে দেখছেন।
আমাদের ‘উন্নয়ন’-এর বুলি বলছে যে সাঁওতাল, মুন্ডা, ওঁরাও, কোন্ধ—এরা সব ‘পিছিয়ে পড়া’ মানুষ, এদের আধুনিকতার আলোয় আনা দরকার। কিন্তু পরিবেশবিদ্যার পাল্টা যুক্তি হলো—মোনোকালচার বড্ড ভঙ্গুর। মুন্ডাদের জঙ্গল বাঁচানোর জ্ঞান, জলের ব্যবহার, বা রাষ্ট্রের লাঠি ছাড়া নিজেদের মধ্যে বিবাদ মেটানোর তরিকা—এগুলো কোনো মিউজিয়ামে সাজিয়ে রাখার জিনিস নয়। বরং, আধুনিকতা যে পদে পদে মুখ থুবড়ে পড়ছে, সেই বিপর্যয় ঠেকানোর এক অব্যর্থ দাওয়াই হতে পারে এই আদিম জ্ঞান।
না, আমি কোনো নস্টালজিয়ায় ভুগে এদের রোমান্টিসাইজ করছি না। পাড়হা সিস্টেমেরও নিজস্ব কিছু ভেদাভেদ আছে; সাঁওতালদের লোককথায় তাদের নিজেদের ভেতরের সংঘাতের গল্পও লুকিয়ে আছে। ফরেস্ট রাইটস অ্যাক্ট ঠিকমতো প্রয়োগ না হলেও, সেটা এক বিরাট, বহু কষ্টে অর্জিত আইনি জয়। প্রশ্নটা এটা নয় যে প্রাক-আধুনিক ব্যবস্থাগুলো সব রামরাজত্ব ছিল কিনা। আসল প্রশ্নটা হলো, “এদের কাছ থেকে আমাদের কিচ্ছু শেখার নেই”—এই কথাটা বলার অধিকার আমরা আদৌ অর্জন করেছি কি না।
আমার তো মনে হয়, করিনি।
এক জায়গায় থিতু হওয়া কৃষি, জাতপাত আর কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রব্যবস্থা হয়তো অনেক অসাধারণ জিনিস তৈরি করেছে। কিন্তু যারা এই ছকের মধ্যে ফিট করতে পারেনি, তাদের জন্য এই ব্যবস্থাটা নিয়ে এসেছে অবর্ণনীয় যন্ত্রণা। সাম্রাজ্যের পর সাম্রাজ্য বদলানোর পরেও যারা নিজেদের বিকল্প জ্ঞান আর শাসনব্যবস্থাকে টিকিয়ে রেখে আজ সমাজের একেবারে প্রান্তে বেঁচে আছে, তারা কিন্তু উন্নয়নের ব্যর্থতা নয়—বরং বলা ভালো, ইতিহাসের এই নিষ্ঠুর খেলায় তারাই হলো সবচেয়ে সফল টিকে থাকা মানুষ।
এই গোলকধাঁধা থেকে বেরোনোর পথ আমার জানা নেই। আমাদের রাষ্ট্রেরও জানা নেই। পাশ্চাত্যের অনুকরণ করে লাভ নেই কারণ তারাও ৬০০ বছরের শিশু। কারণ, সংবিধানে অধিকারের স্বীকৃতি আর বাস্তবে সম্পদ লুঠের উন্নয়ননীতি—এই বৈপরীত্যটা কোনো ভুল নয়। এটা হলো রাষ্ট্রের সেই কাঠামোগত বৈশিষ্ট্য, যার একদিকে যেমন অধিকার ফলানোর আইনি বৈধতা লাগে, তেমনি অন্যদিকে সম্পদ লুঠ করে টাকা রোজগারেরও দরকার পড়ে।
আমি শুধু এটুকুই জানি, নদী সব মনে রাখে। বদ্বীপ আজও নতুন জমি আর নতুন সীমানা তৈরি করে চলেছে, আর ইটন সাহেব যে প্রক্রিয়ার কথা বলেছিলেন—প্রান্তিক মানুষকে নতুন কোনো সভ্যতার ছাঁচে ফেলে আপন করে নেওয়া—সেটা আজও সমানে চলছে। শুধু একটাই প্রশ্ন এখনো খোলা পড়ে আছে—কাকে কে আপন করবে, কোন শর্তে করবে, আর তার জন্য কত দাম চোকাতে হবে?
আটটা পর্ব, একটাই নদী
বাঙালি মানে একটা ভাষা নয়, একটা দেশ নয় — বাঙালি মানে হাজার বছরের মানুষের মিলমিশ।
এই মিলমিশটা এখনো চলছে। নদী এখনো বইছে। বদ্বীপটা এখনো পুবদিকে বঙ্গোপসাগরের দিকে একটু একটু করে বাড়ছে। হিমালয়ের পলি বয়ে এনে এমন সব নতুন জমি তৈরি করছে, যা একশো বছর আগেও ছিল না। এক বা দুই প্রজন্ম পরে ওই নতুন জেগে ওঠা জমিতে কেউ একজন হয়তো ধান ফলাবে, নিজের সন্তানের নাম রাখবে, বাপ-মায়ের কবর দেবে, জলের অধিকার নিয়ে প্রতিবেশীর সাথে ঝগড়া করবে, আর নিজেকে ‘বাঙালি’ বলে দাবি করবে।
আর জানেন তো? সে কিন্তু কোনো ভুল কথা বলবে না।
সূত্র
- রিচার্ড ইটন. ইসলামের উত্থান ও বাংলার সীমান্ত, ১২০৪–১৭৬০ (1993). ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া প্রেস ↗
- নীহাররঞ্জন রায়. বাঙালির ইতিহাস: আদিপর্ব (1949). বুক এম্পোরিয়াম, কলকাতা। রবীন্দ্র পুরস্কার ১৯৫০। ↗
- ভারত সরকার. তফসিলি উপজাতি ও অন্যান্য ঐতিহ্যবাহী বনবাসী (বনাধিকার স্বীকৃতি) আইন (2006). আইন নং ২, ২০০৭। ভারত সরকারি গেজেট, ২ জানুয়ারি ২০০৭ ↗
- ভারত সরকার. পঞ্চায়েত (তফসিলি এলাকায় সম্প্রসারণ) আইন (1996). আইন নং ৪০, ১৯৯৬। প্রণীত ২৪ ডিসেম্বর ১৯৯৬ ↗
- ভারতের সর্বোচ্চ আদালত. সামথা বনাম অন্ধ্রপ্রদেশ রাজ্য (1997). AIR 1997 SC 3297; (১৯৯৭) ৮ SCC ১৯১। রায়ের তারিখ: ১১ জুলাই ১৯৯৭ ↗
- লালন ফকির (আনু. ১৭৭৪–১৮৯০). লালনের গান. মৌখিক সংগ্রহ; প্রামাণিক বাংলা সংকলন: লালন গীতিকা, সম্পা. দাস ও মহাপাত্র (কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস, ১৯৫৪) ↗
এটি এই সিরিজের শেষ পর্ব।