তিনটে উপাখ্যান

AI-drafted + heavily Human-editedI outlined it, an LLM produced a first draft, and I rewrote it extensively.

পূর্ব ভারতের—ঝাড়খণ্ড, পশ্চিমবঙ্গ, বিহার আর উড়িষ্যা মিলিয়ে—প্রায় ৭০ লাখ মানুষের একটা আস্ত জনগোষ্ঠী আছে, যাঁদের গানে গানে আজও এক আশ্চর্য স্মৃতি বেঁচে আছে। কোনো এক দেবতার হাত ধরে পাহাড়ি গিরিখাত পেরিয়ে তাঁরা একদিন পৌঁছেছিলেন পাঁচ নদীর এক সোনার দেশে, যে দেশ কিনা একরাতের নোটিশে তাঁদের ছেড়ে চলে আসতে হয়েছিল। আধুনিক জিনতত্ত্ব বলে দিতে পারে ঠিক চার হাজার বছর আগে তাঁদের পূর্বপুরুষেরা কোথা থেকে এসেছিলেন। আর ওদিকে প্রাচীন সংস্কৃত পুঁথি তাঁদের রাজাদের দেগে দিয়েছিল ‘অসুর’ বা রাক্ষস বলে।

এই জনগোষ্ঠীটি হলো সাঁওতাল সম্প্রদায়। সাঁওতালরা বৃহত্তর মুন্ডা পরিবারেরই একটি শাখা—মুন্ডারি, হো এবং খড়িয়াদের সঙ্গে মিলে এঁরাই তৈরি করেছেন পূর্ব ভারতের অস্ট্রোএশিয়াটিক ভাষার একেবারে আদিস্তর (substrate)। এঁরা মোটেও কোনো প্রান্তিক বা অখ্যাত গোষ্ঠী নন; দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে প্রাচীন এবং নিরবচ্ছিন্ন মৌখিক ইতিহাস বহনকারী জনপদগুলোর মধ্যে এঁরা অন্যতম। আর এঁদের চেনার বা জানার জন্য আমাদের হাতে তিনটি একেবারে আলাদা ‘আর্কাইভ’ বা তথ্যভাণ্ডার রয়েছে: তাঁদের নিজেদের গাওয়া গান, জিনগত প্রমাণ, এবং বাইরের দুনিয়ার পৌরাণিক দৃষ্টিভঙ্গি।

মজার ব্যাপার হলো, প্রত্যেকটি আর্কাইভ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা একটা ছবি ফুটে ওঠে।

এই তিনটে ছবির যে সংঘর্ষ, সেটাই তাঁদের আসল ইতিহাস!


প্রথম লেন্স: গান

১৮৭০-এর দশকে লার্স স্ক্রেফসরুড নামের এক নরওয়েজিয়ান মিশনারি সাহেব সাঁওতাল পরগনায়—যে পাহাড়ি অঞ্চলটি ব্রিটিশরা বাংলা ও বিহার কেটে প্রশাসনিকভাবে তৈরি করেছিল—সাঁওতাল বয়োজ্যেষ্ঠদের সঙ্গে বসে তাঁরা যা বলেছিলেন তা লিখে রেখেছিলেন। এর ফল হলো Horkoren Mare Hapramko Reak Katha বা ‘সাঁওতালদের পূর্বপুরুষদের কথা’। এটি মূলত একটি আদি বৃত্তান্ত। তবে একটু তলিয়ে পড়লে পরিষ্কার বোঝা যায়, এটি আসলে এক দীর্ঘ দেশান্তরের মানচিত্র।

এই যাত্রাপথের পাঁচটা নির্দিষ্ট ধাপ আছে।

হিহিরি পিপিরি। একেবারে আদি বাসস্থান। সাঁওতালি ভাষায় Pipiri-am মানে প্রজাপতি—অর্থাৎ প্রজাপতিদের দেশ: স্নিগ্ধ, নাতিশীতোষ্ণ, মনোরম। এসবই অবশ্য গন্ডগোল শুরুর আগের কথা।

হারাতা। প্রায়-নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার উপাখ্যান। এক সর্বগ্রাসী আগুনে গোটা জনগোষ্ঠী পুড়ে ছাই হয়ে কেবল একটিমাত্র যুগল বেঁচে রইল। সাঁওতালদের মৌখিক ইতিহাসে এই ভয়াবহ বিপর্যয়ের কথা বলা আছে, কিন্তু কারণটা বলা নেই। এটা কি সত্যি কোনো আগুন ছিল? নাকি দুর্ভিক্ষ? নাকি কোনো সামরিক অবরোধ—যখন বাইরের কোনো শক্তির প্রবল চাপে পড়ে একটা আস্ত জনগোষ্ঠী প্রায় মুছে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল? একটা যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা হলো: হারাতা পর্বটি আসলে এক সাংঘাতিক জনমিতিক (demographic) সঙ্কটের স্মৃতি, যা হয়তো মুন্ডা জনগোষ্ঠীর ওপর নেমে আসা কোনো চরম বিপদের সময়কালকে নির্দেশ করে। ব্যাপারটা নিয়ে যদিও ভাষাতাত্ত্বিক মহলে বিতর্ক আছে, এবং প্রমাণিতও নয়—তাই সততার খাতিরে বলা ভালো, এটি ঠিক কোন ঘটনার স্মৃতি তা আমরা আজও নিশ্চিত জানি না।

সাসান বেড়া। ঘুরে দাঁড়ানো এবং নিয়মশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা। বেঁচে যাওয়া মানুষগুলো এক বিশাল নদীর তীরের পলিমাটির সমভূমিতে পৌঁছে নতুন করে জীবন শুরু করল। সাতটি গোত্র বা ‘ক্ল্যান’ তৈরি হলো: মুর্মু, কিস্কু, হেমব্রম, মারান্ডি, সোরেন, টুডু, হাঁসদা। একই গোত্রে বিবাহ নিষিদ্ধ (exogamous)—এমন নিয়ম চালু হলো। এগুলো কোনো কাকতালীয় খুঁটিনাটি নয় মশাই; এ হলো আস্ত একটা সমাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন। এই সাতটি গোত্র আজও অবিকৃতভাবে সাঁওতাল পরিচয়ের মূল সাংগঠনিক কাঠামো হিসেবে টিকে আছে।

জারপি। এক পেরোনো-যায়-না এমন পর্বতমালা। মানুষজন পাহাড় ডিঙোতে পারছে না। তখন তাঁরা মারাং বুরুর (Marang Buru, “মহান পর্বত”) আরাধনা শুরু করল—যিনি সাঁওতাল দেবমণ্ডলীর সর্বোচ্চ দেবতা। মারাং বুরু তাঁদের সিন দুয়ার sin duar · দরজা/তোরণ; সংস্কৃত dvāra থেকে আগত, ইংরেজি 'door'-এর সমগোত্রীয়; দরজার দুটি পাল্লা থাকে—লাতিন duo, গ্রিক duo, সংস্কৃত dvi (দুই)—এবং সাঁওতালিতে du- উপসর্গটি উন্মুক্ত হওয়া বা সূচনার অর্থ বহন করে; এই একটি শব্দেই সমস্ত অর্থগুলো এসে মিলিত হয় (Sin Duar, “সূর্য তোরণ”) নামের এক পাহাড়ি গিরিখাতের সন্ধান দিলেন। মানুষজন সেই পথ ধরে পাহাড় পেরোলো।

চায় চম্পা। সেই সোনার রাজত্ব। সাঁওতালরা এমন এক সুরক্ষিত, কৃষিকাজে উন্নত, স্বাধীন দেশে এসে পৌঁছাল। এটাই এই আখ্যানের চূড়ান্ত বিন্দু: সমৃদ্ধি, স্বায়ত্তশাসন, আর সাংস্কৃতিক ঐক্য। আর তারপরই—তাঁদের নিজস্ব বয়ান অনুযায়ী—সেই দেশ তাঁদের ছাড়তে হলো। একরাতের নোটিশে।

পৈতে হারানোর উপাখ্যান

Horkoren-এর একটা জায়গায় এসে আমি থমকে দাড়াই, কারণ একটা হারানোর স্মৃতি কত নিখুঁতভাবে গেঁথে রাখা যায়, এটা তার একটা চমৎকার উদাহরণ।

বলা হয়, ওই যে সাত ছেলে—সাত গোত্রের প্রতিষ্ঠাতারা—তাঁরা এককালে নাকি পৈতে পরতেন। পৈতে বা যজ্ঞোপবীত (yajñopavīta) হলো ব্রাহ্মণবাদী সমাজব্যবস্থায় ‘দ্বিজ’ বা উচ্চবর্ণের প্রতীক। এটা থাকলে কিছু বৈদিক অধিকার মেলে, সমাজে পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া যায়।

সাঁওতাল আখ্যান বলছে: একবার ওই সাত ছেলে যখন নদীতে স্নান করছিল, তখন ঢ্যামনা সাপ চুপিচুপি এসে সাতজনের পৈতেই চুরি করে পালায়। সেই দিন থেকে সাঁওতালরা আর পৈতে পরে না। এবং সেই দিন থেকে, ঢ্যামনা সাপ দেখলেই তাকে যমের বাড়ি পাঠাতে তাঁরা দুবার ভাবেন না।

এই স্মৃতির গঠনতন্ত্রটা চমকে দেওয়ার মতো। এখানে বলা হচ্ছে না যে ‘আমাদের কোনোদিন পৈতে ছিল না’। বলা হচ্ছে: আমাদের ছিল, কিন্তু সেটা চুরি হয়ে গেছে। এই যে খুঁটিনাটি বর্ণনা—সাতটা পৈতে, সাত ভাই, একটা সাপ, নদী, স্নান—এগুলো হলো গভীর ট্রমার স্মৃতি, কোনো মনগড়া রূপক নয়। এর মধ্যে একটা জোরালো দাবি লুকিয়ে আছে: এককালে সাঁওতালদের সামাজিক মর্যাদা উচ্চবর্ণের হিন্দুদের সমকক্ষ ছিল, এবং সেই অধিকার তাঁদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে।

কে ছিনিয়ে নিল? সাপ তো এখানে একটা রূপক মাত্র, কোনো ব্যক্তি তো নয়। কিন্তু যে ব্রাহ্মণ্যবাদী সমাজব্যবস্থা মুন্ডা জনগোষ্ঠীকে তাঁদের সামাজিক মর্যাদা থেকে বঞ্চিত করেছিল, সেটা তো রক্তমাংসের মানুষদের দিয়েই তৈরি। একটা সহজ ব্যাখ্যা হলো: অস্ট্রোএশিয়াটিক মানুষদের বৈদিক কাঠামোর বাইরে ছিটকে দেওয়ার যে সুদীর্ঘ প্রক্রিয়া শতাব্দী ধরে চলেছিল, তাকেই একটা মাত্র চিত্রে—ওই ঢ্যামনা সাপের প্রতীকে—সঙ্কুচিত করে ধরে রাখা হয়েছে।

খেরওয়াল পরিচয়

সাঁওতালরা নিজেদের মূলত সাঁওতাল বলে ডাকে না। নিজেদের দেওয়া তাঁদের আসল নাম (autonym) হলো খেরওয়াল (Kherwāl)। এই খেরওয়ার পরিচয়ের ছাতার তলায় সাঁওতাল এবং মুন্ডা-ভাষী আরও বেশ কিছু জনগোষ্ঠী পড়ে: এই নামটা এমন এক সম্মিলিত আত্মপরিচয়, যা ঔপনিবেশিক আমলের ‘উপজাতি’ (tribe) নামক প্রশাসনিক বিভাজনের চেয়েও অনেক পুরোনো।

উনিশ শতকে সাঁওতাল পরগনায় খেরওয়ার পুনর্জাগরণ আন্দোলন মাথাচাড়া দেয়। এর মূল লক্ষ্য ছিল প্রাক-হিন্দু যুগের একটা পরিচয় ফিরিয়ে আনা—পৈতে চুরি যাওয়ার আগে তাঁদের যে নিজস্ব সত্তা ছিল, তার কিছুটা অন্তত পুনরুদ্ধার করা। এই আন্দোলন ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দুধর্ম এবং খ্রিস্টান মিশনারিদের ধর্মান্তর—দুয়েরই বিরোধিতা করেছিল। এঁরা জোর দিয়েছিলেন বোনা বোঙ্গা (বনের দেবতার উপাসনা) এবং সাঁওতালদের নিজস্ব ঋতুচক্রের ওপর। এটি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছিল যে Horkoren-এর আখ্যান কেবল একটা রূপকথার গল্প নয়, এটি রীতিমতো একটি রাজনৈতিক দাবি।


দ্বিতীয় লেন্স: Y ক্রোমোজোম

মুন্ডা জনগোষ্ঠীর জিনগত ছবিটা দেখলে চক্ষু চড়কগাছ হওয়ার জোগাড়, এবং প্রথম দেখায় একটু অবিশ্বাস্যই মনে হতে পারে।

সাঁওতালি, মুন্ডারি এবং হো সম্প্রদায়ের বেশিরভাগ মুন্ডা পুরুষের শরীরে ওয়াই-ক্রোমোজোম হ্যাপলোগ্রুপ O1b1a1a রয়েছে। এটি মূলত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার পুরুষদের জিনগত বংশধারা। আজকের দিনে মন, খমের এবং ভিয়েতনামের মানুষদের মধ্যে এটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে আছে। এটি কোনোভাবেই দক্ষিণ এশিয়ার বংশধারা নয়; এর উদ্ভব ঘটেছিল মূল ভূখণ্ড দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কোথাও এবং সেখান থেকেই এটি উত্তর ও পশ্চিমে ছড়িয়ে পড়ে।

২০১৮ সালে ভাষাতাত্ত্বিক পল সিডওয়েল এই জিনগত তথ্যের নির্যাস থেকে একটা সিদ্ধান্তে আসেন: মুন্ডা জনগোষ্ঠীর পুরুষ পূর্বপুরুষেরা সমুদ্রপথে উড়িষ্যার উপকূলে এসে পৌঁছেছিলেন আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ২০০০ থেকে ১৫০০ অব্দের মধ্যে, অর্থাৎ আজ থেকে প্রায় চার হাজার বছর আগে। তাঁরা এসেছিলেন পুব দিক থেকে।

মাতৃবংশীয় (মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ) ছবিটা আবার সম্পূর্ণ আলাদা: মুন্ডা মাতৃবংশীয় ধারাগুলো নিরঙ্কুশভাবে দক্ষিণ এশীয়, অর্থাৎ প্রতিবেশী অন্যান্য জনগোষ্ঠীর সঙ্গে এদের মিল রয়েছে। এই অসাম্য—দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় বাবা, দক্ষিণ এশীয় মা—এটা পুরুষ-প্রধান দেশান্তরের (male-biased migration) একটা অকাট্য জিনগত প্রমাণ। ছোট একটি পুরুষদের দল নৌকা করে উপমহাদেশের পূর্ব উপকূলে এসে পৌঁছায় এবং এখানকার স্থানীয় দক্ষিণ এশীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে মিশে যায়। মৌখিক ইতিহাসের ওই যে স্মৃতি—“আমরা অন্য জায়গা থেকে এসেছি”—তা জিনগতভাবেও অবিকল মিলে যাচ্ছে, বিশেষ করে পিতৃকুলের ক্ষেত্রে।

এবার এই তথ্যটাকে মৌখিক ঐতিহ্যের পাশে রেখে দেখুন। Horkoren বলছে, সাঁওতালরা এমন এক গিরিখাত পার হয়ে এসেছিল—সেই মারাং বুরুর দেখানো সিন দুয়ার। আর জিনতত্ত্ব বলছে, পুরুষ পূর্বপুরুষেরা এসেছিলেন পুব দিক থেকে, সমুদ্রপথে।

এতে কিন্তু কোনো স্ববিরোধ নেই। এরা দুটো আলাদা সময়কালের কথা বলছে।

জিনগত উৎপত্তির ইতিহাসটা চার হাজার বছর পুরোনো। অন্যদিকে মৌখিক দেশান্তরের স্মৃতিটা হয়তো অনেক পরের ঘটনা: দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় নাবিকরা এখানে থিতু হয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে মিশে যাওয়ার শত শত বা হাজার হাজার বছর পরের কোনো ঘটনা, যখন মুন্ডা জনগোষ্ঠী উপমহাদেশের ভেতরেই এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় সরেছে। গানে গানে ধরা আছে তাঁদের শেষ বড় দেশান্তরের স্মৃতি। আর জিনের মধ্যে রয়ে গেছে সেই প্রথমবার এসে পৌঁছানোর ইতিহাস। কোনোটিই ভুল নয়। ভিন্ন ভিন্ন মাধ্যমে মনে রাখা সম্পূর্ণ আলাদা দুটো বিষয় মাত্র।

আর্কাইভগুলোর মধ্যে যে সংঘর্ষের কথা যে বলছিলাম, এটাই। প্রত্যেকটাই নিখুঁত। আবার প্রত্যেকটাই অসম্পূর্ণ। আসল ইতিহাসটা তো লুকিয়ে আছে এদের মাঝখানের ওই জায়গাটিতে।


তৃতীয় লেন্স: সংস্কৃত ভাষার দৃষ্টিভঙ্গি

মহাভারতে পূর্বদিকের রাজ্যগুলোর যে বংশলতিকা দেওয়া আছে, সেটা কিন্তু খুব একটা সুবিধের নয়।

বলা হয়েছে, বঙ্গ, অঙ্গ (পূর্ব বিহার), পুণ্ড্র (উত্তরবঙ্গ), সুহ্ম (দক্ষিণ-পশ্চিম বঙ্গ) এবং কলিঙ্গ (উড়িষ্যা)—এইসব কটি রাজ্য নাকি বালির অবৈধ সন্তানদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত। এই বালি হলেন সেই অসুর asura · দানব; তবে প্রাচীন বৈদিক ব্যবহারে এর অর্থ ছিল 'প্রভু, শক্তিশালী' — আর্য ও অনার্যের সীমানা কঠোর হওয়ার সাথে সাথে শব্দটি পুরোপুরি নেতিবাচক রূপ নেয় (Asura, “দানব-রাজা”), যাঁকে বিষ্ণুর বামন অবতার পরাজিত করে পাতালে পাঠিয়েছিলেন। ব্রাহ্মণ্যবাদী বিশ্বতত্ত্বে পূর্বদিকের এই রাজ্যগুলো তাই জন্মগতভাবেই ‘দানবীয়’।

এটা কিন্তু স্রেফ কাল্পনিক অর্থে কোনো পৌরাণিক গল্প নয়। এটি একটি সুগঠিত রাজনৈতিক বয়ান, যাকে বিশ্বতত্ত্ব বা পুরাণের মোড়কে পরিবেশন করা হয়েছে। মহাভারত আসলে বাধ্য হয়েই স্বীকার করে নিচ্ছে—অবশ্যই তাদের নিজস্ব কায়দায়—যে পূর্বদিকের রাজ্যগুলোতে আর্য-নয় এমন কিছু শাসকগোষ্ঠী রয়েছে, যাদের প্রতাপকে স্রেফ এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। তাই তাদের নিজেদের ব্রাহ্মণ্যবাদী মহাবিশ্বে এই রাজাদের একটা অধস্তন, কলঙ্কিত এবং স্থায়ীভাবে ‘অসুর’ তকমা দিয়ে ঢুকিয়ে নেওয়া ছাড়া গতি ছিল না।

অষ্টম বা নবম শতকের বৌদ্ধ গ্রন্থ আর্য মঞ্জুশ্রী মূলকল্প-তে বলা হয়েছে বঙ্গ ও হরিকেলের (উপকূলীয় বাংলা) মানুষজন “অসুর-ভাষা”য় কথা বলে। কিন্তু এখানে পুঁথিটা একটা অপ্রত্যাশিত কাজ করে বসে: এই ভাষার প্রশংসায় বলা হয় যে এটি “গঙ্গার স্রোতের মতো সাবলীল এবং কাব্যময়”। এখানে ‘অসুর’ তকমাটা আসলে আর্থ-সামাজিক-ভাষাতাত্ত্বিক—এর মানে হলো: পূর্বদেশীয়, প্রতাপশালী, অনার্য এবং বাগ্মী। অসুর-ভাষীরা এখানে কোনো দানব বা রাক্ষস নয়; তাঁরা নিজেদের ভাষায় এত চমৎকার কথা বলেন যে ওই পুঁথি তাকে পুরোপুরি নিজের ছাঁচে ফেলে হজম করতে পারছে না।

কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র (খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকের রাষ্ট্রনীতির ম্যানুয়াল) অসুর-বিজয়ী বা দানবীয় বিজয়ের নিদান দেয়—অর্থাৎ শত্রুর জমি, ধনসম্পদ, গবাদি পশু এবং পরিবারকে পুরোপুরি দখল করে নেওয়া। এটি একটি নিখাদ বিজয়ের ভাষা। একটি পরাজিত জাতিকে সম্পূর্ণ পরাভূত ও মুছে ফেলার blueprint বা protocol।

মুন্ডাদের মৌখিক ইতিহাস—একরাতের নোটিশে চায় চম্পা ছেড়ে পালিয়ে আসা, পৈতে চুরি যাওয়া, পাহাড় আর জঙ্গলের প্রান্তে দেশান্তরী হওয়ার সেইসব স্মৃতি—হলো ঠিক ওইরকম অত্যাচারের শিকার হওয়া সাধারণ মানুষের দিক থেকে লেখা ইতিহাস। অর্থশাস্ত্র ওপরমহলের নীতি বাতলে দেয়। আর Horkoren গানে গানে গাঁথা ত্রিশ প্রজন্ম ধরে বয়ে চলা নিচের তলার মানুষদের ওপর নেমে আসা সেই একই ঘটনার বিবরণ দেয়।


তিন রাজ্যের সীমানা

ভূগোলের ব্যাপারে আমি একটু খুঁতখুঁতে হতে চাই, কারণ ঔপনিবেশিক মানচিত্র ইতিহাসকে বড্ড বিকৃত করেছে।

সাঁওতালদের দেশান্তরের মানচিত্রটা আজকের ঝাড়খণ্ড, বিহার এবং উড়িষ্যার এক বিশাল অংশ জুড়ে বিস্তৃত। এটা স্রেফ কোনো সংকীর্ণ “বাঙালি” ইতিহাস নয়। পশ্চিমবঙ্গ, বিহার এবং ঝাড়খণ্ডের মতো প্রশাসনিক গণ্ডি তৈরি হওয়ার কয়েক হাজার বছর আগে থেকে এই খেরওয়াল পরিচয়ের অস্তিত্ব ছিল। ব্রিটিশরা ১৮৫৫ সালে সাঁওতাল বিদ্রোহের (হুল, Hul, “অভ্যুত্থান”) পর সাঁওতাল পরগনাকে একটা আলাদা প্রশাসনিক এলাকা হিসেবে গড়ে তোলে, কারণ ওই বিদ্রোহ ব্রিটিশদের গদি প্রায় উলটেই দিচ্ছিল আর কি। ব্রিটিশদের আগে, সাঁওতালি-ভাষী মালভূমি আর বাংলা-ভাষী সমতলের মধ্যে কোনো নিরেট প্রশাসনিক সীমানা ছিল না। পুরো এলাকাটাই ছিল মেলামেশা, ব্যবসাবাণিজ্য, শ্রম আর সংঘাতের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।

মহাভারতের ওই বংশলতিকায় বঙ্গ আর কলিঙ্গর পাশাপাশি অঙ্গ রাজ্যের (আজকের পূর্ব বিহার) নামও ছিল। তিনটিকেই অসুরের বংশধর বলা হয়েছিল। অর্থাৎ এই যে কলঙ্ক বা বদনাম দেওয়া, এটা ছিল অঞ্চলভিত্তিক, শুধু বাঙালিদের আটকে রাখা কোনো ব্যাপার নয়। বাইরের দুনিয়ার চোখ গঙ্গা বদ্বীপ থেকে শুরু করে উড়িষ্যা উপকূল হয়ে একেবারে ঝাড়খণ্ড মালভূমি পর্যন্ত পুরো পূর্ব দিকের বাঁকটাকে একই চোখে দেখত।

বাংলা ভাষার যে গভীর ইতিহাস, তা কেবল বাঙালিদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি আসলে পুরো পূর্ব মালভূমির গভীর ইতিহাস—এমন এক বিস্তীর্ণ প্রান্তর যাকে আজকের রাষ্ট্রের সীমানাগুলো হয়তো ভাগ করে দিয়েছে, কিন্তু হাজার হাজার বছর ধরে তা একটাই অভিন্ন ভূখণ্ড ছিল।


শব্দরাই যখন সেতু

ঢেঁকি (dheki, “rice-husking lever”)। ডাঙা (danga, “raised ground”)। ঝাড় (jhar, “forest, waterfall”)। হাঁড়ি (hari, “earthen pot”)। এই সিরিজের প্রথম লেখাটির সেই চেনা শব্দগুলো।

ওপরের তিনটি লেন্স দিয়ে যাঁদের আমরা এতক্ষণ দেখলাম, এগুলো তাঁদেরই শব্দ। সাঁওতালদের মৌখিক মহাকাব্যে এমন মানুষদের কথা বলা হয়েছে যাঁরা পাহাড়ি জমিতে ধান চাষ করতেন। জিনগত প্রমাণ নিশ্চিত করে যে তাঁদের পূর্বপুরুষদের আদি বাসভূমি ছিল এই পূর্ব মালভূমি—রাঢ়, ঝাড়খণ্ডের উঁচুভূমি আর উড়িষ্যার ল্যাটেরাইট মাটির অঞ্চল। আর সংস্কৃত পুঁথি তাঁদের ক্ষমতাকে মেনে নিয়েছিল তাঁদেরই কপালে কলঙ্কের দাগ পরিয়ে।

আর তাঁদের শব্দগুলো আজ বাংলা ভাষার অবিচ্ছেদ্য অংশ। কোনো সম্ভ্রান্ত প্রতিবেশীর কাছ থেকে ধার করা নয়, এগুলো মিশে গেছে এমন এক জনগোষ্ঠীর কাছ থেকে যাদের ভাষাগতভাবে আত্মসাৎ করা হয়েছিল—যাঁদের প্রাত্যহিক জীবনের শব্দাবলি নতুন ভাষায় ঢুকে পড়েছিল কারণ ওই জিনিসগুলো বোঝানোর মতো কোনো সংস্কৃত প্রতিশব্দই ছিল না।

আমি যখন ঢেঁকি (dheki) বলি, তখন আসলে আমি এমন একটা শব্দই উচ্চারণ করি যা সাঁওতালরা বলত। আমি হয়তো বলার সময় তার ইতিহাসটা জানি না। বেশিরভাগ বাঙালিই জানেন না। কিন্তু সেটা আছে, আমাদের ভাষার একেবারে রন্ধ্রে রন্ধ্রে, চার হাজার বছরের গভীরে প্রোথিত হয়ে।

এই আদিস্তর বা সাবস্ট্রেট শব্দগুলো ঠিক এই কাজটাই করে। এগুলো কোনো আলঙ্কারিক জিনিস নয়, নিছক কৌতূহলও নয়—এগুলো হলো একটা আস্ত জনগোষ্ঠীর মিশে যাওয়ার জ্যান্ত প্রমাণ।

সূত্র

  1. লার্স স্ক্রেফসরুড (সংকলক); অনু. পি.ও. বডিং. সাঁওতালদের ঐতিহ্য ও প্রতিষ্ঠান (হড়কোড়েন মারে হাপড়ামকো রিয়াক কথা) (1887 (Santali); 1942 (English trans.)). উনিভার্সিটেট ই অসলো। ১৮৮৭ (সাঁওতালি); ১৯৪২ (ইংরেজি অনুবাদ)
  2. পল সিডওয়েল. "অস্ট্রোএশিয়াটিক ভাষাপরিবার". অক্সফোর্ড হ্যান্ডবুক অব দ্য ল্যাঙ্গুয়েজেস অব সাউথ এশিয়া (2018). অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস
  3. ডেভিড রাইখ প্রমুখ. "ভারতীয় জনসংখ্যার ইতিহাস পুনর্নির্মাণ". নেচার (2009). খণ্ড ৪৬১, পৃ. ৪৮৯–৪৯৪ doi:10.1038/nature08365
  4. বাগীশ নারাসিমহান প্রমুখ. "দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ায় মানবগোষ্ঠীর গঠন". সায়েন্স (2019). খণ্ড ৩৬৫, eaat7487 doi:10.1126/science.aat7487
  5. এইচ.এইচ. রিজলি. বাংলার উপজাতি ও জাতিসমূহ (1891). বেঙ্গল সেক্রেটারিয়েট প্রেস, কলকাতা। ৪ খণ্ড।

পরের পর্ব: যে লোহা তাদের নিজের জঙ্গল কেটেছিল